বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের সময় কিছু অদ্ভুত ঘটনা

Written by:

৫-ই নভেম্বর ১৯৯৭ ইং তারিখের সকাল ৯ টায় জেলা জজ কাজী গোলাম রসুলের দৃষ্টি আকর্ষন করে এক অদ্ভুত অভিযোগ জানায় বঙ্গবন্ধুর খুনী লেফটেন্যান্ট কর্ণেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান।

ফারুক অভিযোগ করে তাকে কারাগারে প্রথম শ্রেণীর হাজতীর মর্যাদা দেয়া হলেও বেশ কয়েকদিন ধরে ফারুক দেখতে পাচ্ছে যে তার খাবারের মান তেমন ভালো নয় মানে তার রান্নায় তেমন স্বাদ হচ্ছে না।

এই বিষয়ে জেল কর্তৃপক্ষকে ফারুক জানিয়েছে কিন্তু তাতেও খাবারের উন্নতি হচ্ছেনা ফলে ফারুক আদালতকে জানায় যে এই ঘটনায় সে খুব অপমান বোধ করছে।

ফারুকের পর পর মেজর (অব) মুহিউদ্দিন আদালতকে একই ভাষায় নালিশ দেয়। তবে মুহিউদ্দিনের বক্তব্য হচ্ছে, তার ডায়াবেটিস কিন্তু একটু হাঁটাহাঁটির ব্যবস্থা-ও কারাগারে নেই।

আসামী লেফটেন্যান্ট কর্ণেল (অব্যাহতি) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানের অভিযোগ তো আরো ‘গুরুতর’। কেমন গুরুতর?

শাহরিয়ার আদালতকে জানাচ্ছে তাকে নির্জন একটি কারাগারে রাখা হয়েছে এবং এতে তার খুব অসুবিধা হচ্ছে। আর এটার প্রতিকার চেয়ে সে জেলা জজ কাজী গোলাম রসুলের কাছে নালিশ করে বসে।

আদালত ধৈর্য্য নিয়ে সব নালিশ শোনেন এবং এই ব্যাপারে কারাগার কর্তৃপক্ষকে আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেন। ঐদিন-ই আদালতের বিরতির সময় কারাগারের সুপরিন্টেন্ডেট আদালতের বিরতির সময় উপস্থিত হয়ে আদালতকে জানান যে ফারুকের অভিযোগ সত্য নয় বরং প্রতিদিন কি খাবে সেই মেন্যু ফারুক-ই নির্ধারন করে দেয় এবং সে হিসেবেই খাবার দেয়া হয়।

উপরের কথাগুলো জেনে আপনাদের নিশ্চই একটু হাসি পাচ্ছে এবং এবং অবাকও লাগছে। তাইনা?

আমি নিশ্চিত বেশীরভাগ মানুষ অবাক হয়েছেন এটি ভেবে যে এই খুনীদের এত তোয়াজ করা হয়েছে নাকি বিচার চলাকালীন সময়ে?

ঠিক একই প্রশ্ন আমারো এসেছিলো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের এই বিচার পর্ব নিয়ে গবেষনা করবার সময়ে। কিন্তু আমি জানতে চেয়েছি খুনীদের প্রতি রাষ্ট্রের এই তোয়াজ করবার ও এত ‘আদরের’ কারন কি?

আমরা এইসব কারন জানবার আগে আসুন একটু জেনে নেই এই বিচারের দীর্ঘ সূত্রিতার আরো বিষ্ময়কর কিছু তথ্য।

সামনে যাবার আগে আপনাদের এখনই জানিয়ে দেয়া ভালো যে বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ-ই মনে করেন ১৫-ই অগাস্ট হত্যাকান্ডের সকল বিচার সম্পন্ন হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ এই ভুলটা করেন।

আমি এই লেখার মাধ্যমে জানিয়ে দিতে চাই আসলে ব্যাপারটি সত্য নয়। ১৫-ই অগাস্ট ১৯৭৫ সালে মূলত ৪ টি স্থানে খুনীরা হত্যাকান্ড চালায়।

(১) বঙ্গবন্ধুর ৩২ নাম্বার রোডের ৬৭৭ নং বাসায় বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার, স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ সদস্য এ এস আই সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল উদ্দিন, সৈন্য সৈয়দ শামসুল হক (১১ জন) আহত ৩ জন। [মুহিতুল ইসলাম, ডি এস পি নুরুল ইসলাম ও সেলিম]

(২) আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ২৭ মিন্টু রোডের বাসার হত্যাকান্ড (৬ জন)

(৩) শেখ ফজলুল হক মনির ধানমন্ডির ১৩/১ নং এর বাসায় হত্যাকান্ড (২ জন)

(৪) মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সুরী রোডের ৮, ৯, ১৯৬ ও ১৯৭ নম্বর বাড়ির (টিনশেড বস্তি) ওপর কামানের আঘাতে নিহত ১৩ জন ও আহত ৪০ জন

এই কামানের গোলায় মোহাম্মদপুরের একটি পেট্রোল পাম্পে এক কিশোরও নিহত হয় বলে জানা যায় কিন্তু এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কোনো মামলা হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত কোনো সূত্রে আমি পাইনি।

আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে শুধু বঙ্গবন্ধুর বাসায় সংগঠিত হত্যাকান্ডের বিচার কেবল সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু আজ পর্যন্ত সেরনিয়াবাত, শেখ মনি ও মোহাম্মদপুরের হত্যাকান্ডের বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি।

ইনফ্যাক্ট ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে সেরনিয়াবাত হত্যাকান্ডের বিচার আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়ে রয়েছে।

এই নৃশংস হত্যাকান্ডের এতটা বছর পর যেখানে আওয়ামীলীগ এখন পর্যন্ত ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২০ পর্যন্ত ক্ষমতায় কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে উপরে উল্লেখিত বাকি তিনটি হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি আজও।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন মানুষ শুরুতেই মনে করে নেন ‘আরে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলো ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ফলে তাঁর বাবার হত্যাকারীদের তিনি কয়েকমাসের মধ্যেই ফাঁসি দিয়ে দেবেন’।

এই মনে করবার প্রধান কারন হচ্ছে সাধারণ জনতা মনে করেন এই দেশের আইন আদালত রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ইচ্ছেমত নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দায়রা আদালতের জজ, হাইকোর্ট, এপিলেট ডিভিশানের বিচারপতিরা সরকারের কথায় উঠবেন আর বসবেন। বলতে দ্বিধা নেই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিচারের ক্ষেত্রে আমার বার বার মনে হচ্ছিলো কি হচ্ছে এসব? এত দেরী কেন?

কিন্তু বাস্তবতা ছিলো চরমভাবে ভিন্ন। আমার অবজার্ভেশনমতে, আওয়ামীলীগ সরকার এই পুরো বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে সিম্পলী বিদ্যমান আইনের নিয়ম কানুন আর গতির মধ্যে রেখেছিলো এবং সেটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি। পুরো মামলার ব্যাপারে দীর্ঘদিন পাঠের পর আমার মতামত এটি।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনী সিস্টেমের যে শামুক গতি এবং যত যত ধাপ রয়েছে, এগুলো যদি আসলে যথাযথ ভাবে পালন করতে হয় তাহলে একটি ফৌজদারী বা দেওয়ানী যে কোনো মামলা দশকের পর দশক ধরে ঝুলতে থাকে।

আমরা সবাই ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধু সহ বাকি হত্যাকান্ডের বিচার স্পেশাল ট্রাইবুনাল বানিয়ে খুব দ্রুততার সাথে হয়ে যাবে কিন্তু তা হয়নি। আশ্চর্য হলেও সত্য যে ততকালীন সরকার এই বিচার প্রক্রিয়াকে অন্য সব ফৌজদারী অপরাধের বিচারের মত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ছেড়ে দেন।

আর সে কারনেই বোধকরি সেরনিয়াবাত হত্যাকান্ড, শেখ মনি হত্যাকান্ড কিংবা মোহাম্মদপুরের ১৩ টি হত্যাকান্ডের বিচার আজকের তারিখ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। ইনফ্যাক্ট উপরে তো বলেছিই-ই যে আদালতের আদেশে সেরনিয়াবাতের বিচার স্থগিত হয়েই আছে।

আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের জন্য মামলা করা হয় ১৯৯৬ সালের ২শরা অক্টোবর। উল্লেখ্য ২৩ জুন ১৯৯৬ ইং তারিখে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের পর ৪ মাস লাগলো মামলা হতে, এটি আমাকে ভাবিয়েছে। হয়ত প্রস্তুতির দরকার ছিলো। এটি এক্টি যুক্তি হতে পারে।

৩ শরা অক্টোবর এই মামলার তদন্ত কাজ শুরু হয়। তদন্ত শুরু করেন সি আইডি’র আব্দুল কাহার আকন্দ সাহেব।

পরের মাসের ১২ তারিখ, অর্থ্যাৎ নভেম্বরে (১৯৯৬) সঙ্গসদে ইন্ডেমনিটি বিল বাতিল করবার জন্য প্রস্তাব পাশ হয়। যারা ইন্ডেমনিটি বিল কি এখনো জানেন না, তাদের জন্য সংক্ষেপে বলে রাখি যে, বঙ্গবন্ধুকে খুনের পর খুনী মোশতাক একটি অধ্যাদেশ জারি করে ২৬ শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ সালে যেখানে ১৫-ই অগাস্টের এই ভয়াবহ খুনের বিচার যাতে না হতে পারে সেটির জন্য একটি আলাদা অধ্যাদেশ জারি করে এবং এই খুনের ঘটনাকে প্রাথমিক বৈধতা দেয়।

পরবর্তীতে অবৈধ সামরিক শাসক ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ও বেনিফিশিয়ারী জেনারেল জিয়াউর রহমান এই অধ্যাদেশটিকে ৫ম শংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ৫-ই এপ্রিল বাংলাদেশের সংবিধানের ৪র্থ অধ্যায়ের ১৮ তফসিলে অন্তর্ভূক্ত করে এটিকে চূড়ান্ত বৈধতা দেয় জাতীয় সংসদে।

যাই হোক, কিন্তু এই ইন্ডেমনিটি বিল বাতিল করবার আইনের বিরুদ্ধে খুনী ফারুকের মা এবং আরেক খুনী সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান একটি রিট পিটিশন দাখিল করে বাংলাদেশ সূপ্রীম কোর্টে।

১৩ দিন শুনানির পর হাইকোর্ট ডিভিশান ২৮ শে জানুয়ারী ১৯৯৭ সালে এই ইন্ডেমনিটি বিল বাতিল আইন সঠিক হয়েছে বলে তাদের সিদ্ধান্ত জানায়। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উপরে উল্লেখিত ওই দুই ব্যাক্তি আপীল করে।

১৯৯৮ সালের ২ মার্চ আপীলেট ডিভিশন হাইকোর্ট ডিভিশানের সিদ্ধান্ত আপহোল্ড করে অর্থ্যাৎ হাইকোর্টের রায়টি-ই বজায় রেখে সিদ্ধান্ত দেয় ফলে বিচারের ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিবন্ধতাই থাকলো না।

আদালত এই রিটের নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বলেন-

37. Mr. Korban Ali raised the question of mala fide also because the criminal cases were stated even before the repeal of the Indemnity Ordinance. It has been noticed that in such mat¬ters what is of importance is the authority to act and not with what motive the action is taken.

It could not be said that the alleged bar under the Indemnity Ordinance was attracted automati¬cally as soon as the FIR was lodged, It has/had to the pleaded at some stage. Since the Ordinance has already been repealed, the bar does no longer operator and no question of mala fide can be raised in opposition to the pro¬ceedings.

In view of discussion above, these appeals cannot succeed and are accordingly dismissed without any order as to costs.

চিন্তা করা যায়? আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে ১৯৯৬ সালের ২৩ শে জুন আর ইন্ডেমনিটি আইন বাতিল করতে করতেই চলে যায় টানা ২ টি বছর। তবে এই ইন্ডেমনিটি আইন বাতিলের রিট চলা অবস্থাতেই অবশ্য আসামী ফারুক, শাহরিয়ার, যোবায়দা রশীদ, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, ওয়াহাব জোয়ার্দার গংদের গ্রেফতার করে বিচার প্রক্রিয়া চলছিলো।

একটা পর্যায়ে এই মামলাকে সি এম এম আদালত থেকে সরিয়ে দায়রা আদলতে ট্রান্সফার করা হয় এবং এর জন্য নাজিম উদ্দিন রোডে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে একটি ভবনে একটি বিশেষ আদালত গঠন করা হয়।

আদালতের জজ কাজী গোলাম রসুল আসামীদের ডিভিশান প্রদান করেন এবং কারাগারে তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ ও সুবিধা নিশ্চিত করতে তিনি নির্দেশ দেন।

আসামীরা করলো কি, তাদের একজন বিচারপতি গোলাম রসুলের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার কারনে ২১ শে এপ্রিল ১৯৯৭ বিচার কাজের মুলতবি হয়। এই অনাস্থা আবেদন হাইকোর্ট নাকচ করে দেয় ২৯ শে এপ্রিল। তখন বিচারকাজ আবার শুরু হয়।

আসামী পক্ষ আবার দাবী তোলে কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশের ভবনে এই বিচার চলবে না। তারা যায় হাইকোর্টে। হাইকোর্ট এই আবেদনও নাকচ করে দেয় ৩০ শে এপ্রিল ১৯৯৭ ইং তারিখে।

এক মাস পর ৪ ই মে ১৯৯৭ ইং তারিখে আসামী যোবায়দা রশীদ তাকে কেন আসামী করা হয়েছে এই অভিযোগ নিয়ে হাইকোর্টে পিটিশান দাখিল করে। বিচার বন্ধ হয়ে যায় এক মাসের জন্য।

এই আপত্তি-পিটিশান-হাইকোর্ট-সূপ্রীম কোর্ট এগুলো করতে করতে একটা পর্যায়ে হাইকোর্ট এই বিচার থেকে যোবায়দা রশীদকে অব্যাহতি দেয়। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই ষড়যন্ত্রের পুরোটা সময় যোবায়দা রশীদ তার স্বামী মেজর আব্দুর রশীদের সাথে সঙ্গ দিয়ে গেছে। ৬-ই জুলাই ১৯৯৭ সালে আবার বিচার শুরু হয়।

এইবার টানা বিচার চলার পর ১৩-ই অক্টোবর ১৯৯৮ সালে মামলার চূড়ান্ত যুক্তি তর্ক সমাপ্ত হয় এবং ওই একই বছরের ৮-ই নভেম্বরে ১৯ আসামীর মধ্যে ৪ জনকে বেকসুর খালাশ দেন আর বাকী ১৫ আসামীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন।

উল্লেখ্য যে ঐদিনি এই মামলার অন্যতম আসামী বজলুল হুদাকে ব্যাংকক থেকে ধরে দেশে নিয়ে আসা হয়। জেনে রাখা ভালো যে বজলুল হুদা ব্যাংককে একটি শপিং সেন্টারে চুরির দায়ে ধরা পড়ে পরে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এই রায়টি-ও ছিলো আমার মতে এক অদ্ভুত রায়। আসামী আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার যে কিনা বঙ্গবন্ধুর বাসায় ঐদিন লুটপাট করে, আগের দিন রক্ষীদের সকল গোলাবারুদ পরিবর্তন করে আনবে বলে নিয়ে চলে যায় এবং ওইদিন তার কর্মকান্ডে খুশি হয়ে বাকি খুনীরা তাকে অনারারী ক্যাপ্টেনের পদ পর্যন্ত দেয় সেই আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার বেকসুর খালাশ পায়।

তাহের উদ্দিন ঠাকুরের মত এত বড় ষড়যন্ত্রকারী বেকসুর খালাশ পায় ফলে এই রায়ে আসলে পুরোপুরি উচ্ছসিত হওয়াটা অন্তত আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য যে দায়রা আদালতে যুক্তি তর্কের সময় খুনী ফারুকের আইনজীবি খান সাইফুর রহমান দাবী করে যে ১৫-ই অগাস্টের অভ্যুত্থান একটি সফল অভ্যুত্থান ফলে এটা আইনসিদ্ধ এবং সেদিনের ঘটনা আইনি ভাবে সঠিক। খুন কিভাবে আইনীভাবে সঠিক হয় আজ পর্যন্ত আমি তা বুঝতে পারিনি বোধকরি ভদ্রলোকের এই আর্গুমেন্ট সকলেরই বুঝতে সমস্যা হবে।

খান সাইফুর রহমান আরো বলে এই হত্যাকান্ডে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কিসিঞ্জার ও সি আই এ জড়িত ফলে তাদের বিচার হতে হবে। এইভাবে আসামী পক্ষের আইনজীবিরা অদ্ভুত সব কথা বার্তা এনে যুক্তি দিতে শুরু করে। এক আইনজীবি শরিফুল ইসলাম মুকুল তো বলেই বসে বঙ্গবন্ধু নিজেই নিজের গায়ে বোম রেখে আত্নহত্যা করে।

মূর্খতার ও অজ্ঞানতার আসলে সীমা কিংবা পরিসীমা নেই।

যাই হোক এই রায় হয়ে যাবার পর আসামী পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করে হাইকোর্টে। দেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয় ১১ নভেম্বর ১৯৯৮ ইং তারিখে কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে এই দেথ রেফারেন্স ও আপীল হাইকোর্টের শুনানীর তালিকায় আসে ৩০ শে মার্চ ২০০০ সালে। মানে নিম্ন আদালতের রায়ের দেড় বছর পর।

তালিকায় আসার পর শুরু হয় আরেক নতুন খেলা। বিচারপতি আমিরুল কবির ১০-ই এপ্রিল এই শুনতে বিব্রত বোধ করে। ২৪ শে এপ্রিল এই মামলা বিচারপতি আব্দুল মতিন ও বিচারপতি এম এম রুহুল আমিনের বেঞ্চে গেলে তারাও শুনতে বিব্রত বোধ করে। এত বিব্রতবোধ আর বিব্রতবোধের খেলায় শেষ পর্যন্ত ২৮ শে জুন ২০০০ সালে হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চে শুউর হয় শুনানী।

২৮ শে নভেম্বর ২০০০ সালে আসামী ও রাষ্ট্রপক্ষের ৬৩ দিনের শুনানী শেষ হয় এবং রায় হয় বিভক্ত। বিচারপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন ১০ আসামীর মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন বাকি ৫ তাকে খালাশ দেন। অন্যদিকে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ আসামীর-ই মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন। এই বিভক্ত রায় নিষ্পত্তির জন্য ব্যবস্থা নিতে প্রধান বিচারপতির কাছে প্রেরণ করা হলে তিনি বিচারপতি ফজলুল করিমের একক বেঞ্চে এই মামলা প্রেরণ করেন।

তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে বিচারপতি করিম তিনজনকে খালাস দেন ২০০১ সালের ৩০ শে এপ্রিল। এরি মধ্যে দিয়ে শেষ হয় হাইকোর্ট পর্ব। চূড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ১২ আসামির মধ্যে পরে ওই বছরই কারাবন্দি চার আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন।

২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বি এন পি আমলে এই মামলার কার্যক্রম স্থবির হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। এই সময় বিচারপতি গোলাম রব্বানি, বিচারপতি বি আর মোদাচ্ছির হোসেন, বিচারপতি কে এম হাসান, বিচারপতি আবু সাঈদ আপিলের শুনানিতে বিব্রতবোধ করে ফলে এক পর্যায়ে পুরো মামলাটিকে কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়।

কোন দেশ এটি? যেখানে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানিতে বিচারপতির পর বিচারপতি বিব্রতবোধ করবার এক অদ্ভুত খেলায় মেতে ওঠেন তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পরেও। এই দেশের জন্যই কি তিনি প্রাণ দিয়ে গিয়েছিলেন?

এর মধ্যে ১৩-ই মার্চ ২০০৭ সালে এই মামলার অন্যতম আসামী মহিউদ্দিনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয় এবং ঐ একই বছরের ২শরা অগাস্ট লিভ টু আপীলের শুনানীর জন্য বেঞ্চ গঠন করা হয়। ২৬ দিন শুনানীর পর আপীলেট ডিভিশান আপীল লিভ টু আপীল মঞ্জুর করেন।

এই মঞ্জুরের পর প্রায় দুই বছর লেগে যায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির সার-সংক্ষেপ দিতে দিতে। এই দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ঘটে যায় নানাবিধ বিপর্যয়। সুডো সামরিক শাসন আসে দেশে, রাজনীতিবিদেরা টিন, চাল, গম চুরির দায়ে একের পর এক জেলে যেতে থাকে।

২৪ শে অগাস্ট আপীল বিভাগের প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন এই মামলার আপীল হিয়ারিং এর জন্য ৫-ই অক্টোবর তারিখ ধার্য করেন এবং আগের দিন অর্থ্যাৎ ৪ তারিখে তিনি শুনানীর জন্য বেঞ্চ গঠন করেন।

বেঞ্চে থাকেন মাননীয় প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন নিজে, বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মোহাম্মদ তাফাজ্জল ইসলাম, বিচারপতি বিজন কুমার দাস এবং বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ।

শুনানী শেষে ১৭-ই ডিসেম্বর ২০০৯ সালে ৫ বিচারপতি ৪১২ পাতার রায় দিয়ে খুনীদের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন।

এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষ আবার রিভিউ পিটিশান দাখিল করে ২০ শে জানুয়ারী ২০১০ ইং তারিখে এবং রিভিউ পিটিশান খারিজ হয় ২৭ শে জানুয়ারী ২০১০ ইং তারিখে এবং ওইদিন মধ্য রাতে অর্থ্যাৎ ২৮ শে জানুয়ারীর প্রথম প্রহরে খুনীদের ফাঁসী কার্যকর হয়।

১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর থেকে ২৮ শে জানুয়ারী ২০১০ সাল। প্রায় ১৪ বছর লেগে গিয়েছে আত্নস্বীকৃত ও দাম্ভিক খুনীদের বিচার করতে গিয়ে। তাও শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার করতে গয়ে। কিন্তু এক যুগেরও বেশী সময় পার হয়ে গেলেও হয়নি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসার হত্যাকান্ড, শেখ মনি ও তাঁর স্ত্রীর হত্যাকান্ড এবং মোহাম্মদপুরের ১৩ জন হত্যাকান্ডের বিচার।

আপীলেট ডিভিশান বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের রায় দিতে কিছু কথা বলেন যা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করি-

There is no denial of the fact the appellants and other accused persons not only killed the sitting President of the country, they killed the entire family. The victim, the then President, who had sacrificed his life for the cause of the people – his struggle for the just and the democratic rights of the people of the country was marked by extraordinary patriotism.

The liberation struggle of Bangladesh from the treacherous occupation of the marauding military ruler of Pakistan was a rare example of a patriotic was fought by the people from inside and outside under order of Bangabandhu which was clearly proclaimed in a historic public meeting on 7th March 1971.

This historic speech not proclaimed guidelines for action but also inspired the deep determination of the people to fight for the independence. He was determined on the creation of independent Bangladesh and advanced strategically through the six point charter of demands. The six points were later on led to one point – the independence from which Bangabandhu did not return.

Consequently we achieved our independence. The accused persons brutally killed such a leader who is none but the father of the nation. They even did not spare the child son of the President who was below 10 years old. They killed him in such a brutal manner the nation was shocked and dumbfounded. There was no explanation why they killed the three women. They committed the crime against humanity by killing a child and three innocent women who were unarmed.

They eliminated almost the entire family who were found in the house. There is no explanation on the side of the accused as to why they killed these innocent persons.

The acts of the accused was so barbarous which could only be compared with orgies. The accused persons by their barbarous act proved that the object of the conspiracy was not to oust the President from power, but their object was to eliminate the entire family and it was an act of exceptional depravity on the part of the accused persons, an unparallel act in the annals of crime committed in the country.

খুনীরা এমন একজনকে হত্যা করেছে যিনি সারাটি জীবন এই দেশের মুক্তির জন্য লড়ে গেছেন। খুনীরা ছাড় দেয়নি ১০ বছরের ছোট বাচ্চা কিংবা বাড়ীর নানিরীহ নারীদের। আদালত তাই এই অপরাধকে তুলনা করেছেন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে। আদালত বলে এই জঘন্য অপরাধের আসলে আর কোনো তুলনা নেই।

আমি যে তথ্য দিয়ে এই লেখাটি শুরু করেছিলাম সেটি হচ্ছে এই ঘৃণ্য অপরাধ করেও আসামীরা কি অবলীলায় সুখাদ্য চাইবার বায়না ধরে, নির্জনে না থাকার বায়না ধরে কিংবা হাঁটাহাঁটি করবার বায়না। বায়নার যেন শেষ নেই। আদালত দেখা যাচ্ছে তাদের সমস্ত অধিকার বজায় রাখতেও সচেষ্ট ছিলো।

এই পুরো ব্যাপারটির মধ্যে এটি খুব স্পস্ট যে এই বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকারী দলের ইন্টারেস্ট থাকার পরেও তারা যেই ধৈর্য্য দেখিয়েছে বিশেষ করে শেখ হাসিনা, এটা এক কথায় অকল্পনীয়। নিজের পিতা হত্যার পুরো ব্যাপারটি তিনি অসীম ধৈর্য্যের সাথে ছেড়ে দিয়েছেন আইন আর আদালতের উপর। এক বিন্দু পরিমানে তিনি আইনে হস্তক্ষেপ করেনি যদিও এই বাংলাদেশে এটি করা যেতে পারতো খুব সহজেই।

অথচ লক্ষ্য করে দেখুন এই বিচারের প্রতিটি ধাপের পর ধাপ। আমি নিশ্চিত আমি যেমন লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেছে গত ৩ ঘন্টা ধরে একইভাবে আপনারাও ক্লান্ত হয়ে গেছেন এই বিচারের এই দীর্ঘ সূত্রিতা দেখে।

কিন্তু সত্য হলেও এটাই সত্য। আমাদের এই জাতির জনকের হত্যার বিচার বৈধ কিনা সেটি নিষ্পত্তি করতেই আদালতে চলে গেছে দুইটি বছর আর মোটামুটি ৬-৭ বছর চলে গেছে বিচার ছাড়া এই দেশের-ই আলো হাওয়ায় বড় হওয়া বিচারপতিদের বিব্রত হবার মধ্য দিয়ে।

আসলে শুধু মাত্র এই বিচারটার দিকে তাকালেই কত কিছু বুঝতে পারা যায় এই দেশটার সম্পর্কে। এই দেশের আইনের শাসন, এই দেশের একজন বিজ্ঞ বিচারপতির চিন্তা-ভাবনার ব্যাপারে।

আমরা তারপরেও এই দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখি। দেশ নিয়ে এগুবার ইচ্ছে পোষন করি। নিজের জীবন দিয়ে এমন স্বপ্ন দেখবার শিক্ষাই পিতা দিয়ে গেছেন আমাদের।

এই ব্লগে প্রকাশিত লেখাটি আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল যা যথাযথ নথিপত্র ও রেফারেন্স দ্বারা সমৃদ্ধ ও সমর্থিত। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমাদের সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমরা ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমাদের লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমাদের জন্য বড় সৌভাগ্য। আমরা সেটির জন্য আনন্দিত। গুজবের জবাবে সত্য পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।

Discover more from গুজবের জবাব-Gujober Jobab

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading