ধর্ম নিয়ে সাধারণত যে রাজনৈতিক ব্যবসার দীর্ঘ ইতিহাস এই পৃথিবী জুড়ে; সুনির্দিষ্টভাবে বললে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিরাজমান ১৫ অগাস্টের পর খন্দকার মোশতাক সেটির বাইরে ছিলেন না বরং রাজনৈতিকভাবে এই ব্যবসার প্রবল ব্যবহার বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরেই আমরা দেখতে পাই। কেননা এই অঞ্চলের রাজনীতিতে ধর্ম ছিলো এক অব্যার্থ অস্ত্র। জয়প্রকাশ নারায়ন তাঁর ‘প্রিজন ডায়েরী’ গ্রন্থের ১৯ নাম্বার পৃষ্ঠায় খন্দকার মোশতাককে ‘একটু বেশীই’ মুসলিম বলে অভিহিত করেছিলেন এবং একইসাথে পশ্চিমপন্থী বলেও অভিহিত করেছিলেন। জয়প্রকাশের এই বাক্যের ভেতর স্পস্টত সার্কাজম ছিলো। একজন পশ্চিমাপন্থী লোকের অতিরিক্ত মুসলিম সাজার মধ্যে বোধকরি কৌতুকই রয়ে গেছে। তিনি তাঁর গ্রন্থে আরো বলেন ভারতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মোশতাক ছিলো অনেকটা একঘরে। তাজউদ্দিন আহমদ ও সৈয়দ নজরুলের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলোনা। মোশতাক দেখতে বাঙালীদের মত ছিলোনা যদিও তার গড়পড়তা উচ্চতা শারীরিক কাঠামো ছিলো বাঙালীদের মতন। জয় প্রকাশের বক্তব্যের অংশটুকু এখানে উঠিয়ে দেয়া যেতে পারে-
I never met Mujib in person. Except for him I knew rather intimately all the other political and military leaders of Bangladesh at the time of the Provisional Government. I knew Khondokar Mushtaq Ahmed then. My recollection of him is of a slim person of average height who always sported, non-Bengali like, a cap. It was apparent then that he was not on good terms with Tajuddin Ahmed and also perhaps with Nazrul Islam. Sen re- ported to me after his return from Bangladesh that Mushtaq Ahmed was alienated in exile in India he had appeared to be as ardent an admirer of Mujib as the other leaders from Mujib, perhaps because he was not given the foreign office or another equally important cabinet job. Sen also told me that in the Awami League and in the country generally, if there was anyone who could challenge Mujib’s leadership it was Khondokar Mushtaq Ahmed. Who knew that this was the way in which the challenge was to come and succeed?… One last word: I had formed two impressions of Ahmed, that he was somewhat pro- Western and a little more Muslim-in the sectarian sense than the others।[1]
মাথায় কালো টুপি, গায়ে কালো আচকান আর মুখে ধর্মের মিষ্টি কথায় তিনি বাংলাদেশের জনতাকে প্রথমে ধোঁকা দিতে চেয়েছিলেন। পূর্ব অধ্যায়ের আেলোচনা থেকে একটা বিষয় স্পস্ট যে মোশতাক আওয়ামীলীগের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত চলে গেলেও ভেতরে সে লালন করেছিলো মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক চরিত্রের পুরো অংশটাই। এটা হয়ত দুঃখজনক কিন্তু সত্য যে পাকিস্তানে যে ধর্মের হীন রাজনৈতিক ব্যবহার হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সেই ধর্মের রাজনৈতিক চর্চার বলয় কখনোই ভাঙ্গেনি। একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কবি দাউদ হায়দারকে ১৯৭৪ সালের ২২ শে মে দেশ ছাড়তে হয়েছিলো। কবির অপরাধ যে তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটার নাম হচ্ছে, “কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নার কালো বন্যায়”। সে সময় ধর্মীয় মৌলবাদীদের অব্যাহত আন্দোলন ও দাবীর মুখে বঙ্গবন্ধু সরকার কবির নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কবিকে কলকাতায় পাঠান। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে মুক্তিযুদ্ধের আগের এই ধর্মের দুঃসহ রাজনৈতিক ব্যবহারের পরেও ঠিক মুক্তিযুদ্ধের ৩ বছরের মাথায় সামান্য একটা কবিতা লেখার অপরাধে কেন একজন কবিকে বাংলাদেশ ছাড়তে হবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত রয়েছে তবে এই ঘটনা তৎকালীন ধর্মীয় মৌলবাদীদের একটি বিষিয় নিশ্চিত করে দেয় যে এই বাংলাদেশে ধর্মের ‘ভালো ব্যাবহারের সুযোগ’ পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবার পরেও রহিত হয়নি। দাউদ হায়দার ছিলো তাদের ‘টেস্ট কেইস’। খন্দকার মশতাক ছিলো আওয়ামীলীগের মধ্যে এই মৌলবাদী গোষ্ঠীর অনুচর মাত্র যাকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগের সাথে সাম্প্রদায়িক শক্তি তথা ডানপন্থীদের একটা সংযোগ বরাবরই থেকে গিয়েছিলো। আওয়ামীলীগ এটিকে হয়ত লক্ষ্য করেনি কিংবা লক্ষ্য করেও গুরুত্ব দেয়নি এই দুই ব্যখ্যাই হতে পারে তবে আওয়ামীলীগের প্রগতিশীল অংশ কিন্তু খন্দকার মোশতাকপন্থীদের ব্যাপারে নানাভাবেই সতর্ক করেছে। এই অংশের আলোচনা শুরুর প্রাক্কালে ৪৭ পরবর্তী পাকিস্তানের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামীলীগের রাজনীতির চালচিত্র বুঝে নেয়াটা জরুরী। যেই রাজনীতির একটা দীর্ঘ পরিক্রমা রয়েছে এবং এই পরিক্রমায় খন্দকার মোশতাক নিজেও যেটির সারথী ছিলো। এই রাজনীতির স্বরূপ আমাদের পর্যালোচনা করাটা জরুরী।
দেশভাগের পর মুসলমানরা আলাদা যে জাতিসত্বার বিকাশ চেয়েছিলো সেটি কতটুকু উত্তীর্ণ হয়েছিলো পাকিস্তান পর্বে? পূর্ব পাকিস্তান মানে আমাদের আজকের বাংলাদেশ এবং পশ্চিম পাকিস্তান মানে আজকের পাকিস্তান যে মূলত ধর্মের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র জাতি গঠিত করে আগের বঞ্চনা আর আধিপত্যবাদের নির্মূল চেয়েছে সেটি কি কার্যকরী ছিলো? প্রশ্নটির সহজ উত্তর হচ্ছে, না সেটা কার্যকর হয়নি। কার্যকর তো হয়-ই নি বরং দ্বি-জাতি তত্ব যে আসলে একটা ভ্রান্ত তত্ব সেটি বার বার প্রমাণিত হয়েছে। দেশভাগের পর হয়ত হিন্দু আধিপত্যবাদের ও তাদের এলিট, সামন্তদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকা গেছে কিন্তু এই আধিপত্যবাদ আবারো নতুন এই পাকিস্তানে আবারও ফিরে এসেছে আরো তীব্র হয়ে।
সাতচল্লিশ এর দেশভাগের মূল দর্শন ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হলেও এখানে সাম্প্রদায়িক ভাবনার ভয়াবহ আধিপত্য ছিলো শুরু থেকেই। সাম্প্রদায়িকতার নানান রূপের সাথেই বরংচ বাংলাদেশ পরিচিত হয়েছে। যে সমাজে সাম্যবাদ অনুপস্থিত, সকলের কথা বলবার অধিকার, মতামত দেবার, টলারেন্স প্রবণতা শূন্যের কোঠায় সেখানে ধর্ম ভিত্তিক জাতি গঠন আসলে আধিপত্যবাদের নতুন মোড়ককেই পত্তন করে। আগেই বলেছি শুধু কি ধর্মীয় ভিত্তিতে সম্প্রদায় গঠিত হয়, শুধু কি জাতীয়তার ভিত্তিতে সম্প্রদায় গঠিত হয়? উত্তর হচ্ছে না। তা নয়। সম্প্রদায় গঠিত হতে পারে একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে আরো উপ-দর্শনের ফলশ্রুতিতে, সম্প্রদায় গঠিত হতে পারে চিন্তার ঐক্যের ফলে, সম্প্রদায় হতে পারে পেশার ঐক্যে, আঞ্চলিকতার ঐক্যে। সুতরাং সম্প্রদায় যতই গঠিত হোক কিংবা যতই ধর্ম ভিত্তিক পার্থক্য থাকুক না কেন যদি এই হাজারো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা কিংবা সাম্যের ভিত্তিতে বা পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যায়গাটা শক্তিশালী একটি ভিত্তিতে পরিণত না হয় তবে আলাদা জাতি গঠন-ই সমাধান নয়।
দেশভাগের পর ধর্মের উপর ভিত্তি করে একটিও একক জাতির একক দেশ গঠিত হলেও সেখানে ছিলো সাম্প্রদায়িকতার বীজ, সেখানে ছিলো আধিপত্যবাদের, ক্ষমতার একচ্ছত্র নোংরামো। মুসলমানরা আগে যেখানে অপবিত্র ধ্যান হয়েছে, স্লেচ্ছ নির্নীত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বারা সেখানে এই পাকিস্তানে এক অংশের মুসলমান আরেক অংশের মুসলমানকে “হিন্দু প্রভাবিত মুসলমান” মনে করেছে, বাঙালীকে অগ্রাহ্য করেছে সমাজের সব ক্ষেত্রে নানান অবহেলায়। এই অবহেলা, আধিপত্যবাদ, বঞ্চনার প্রেক্ষিত রচনার পথে একটা বড় ঘটনা হচ্ছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন।দেশভাগের মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই বাঙালীর নিজস্ব মাতৃভাষা যেটি তার সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উপকরন সেটিকে তীব্র লাঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানী শাষকদের কাছ থেকে।
বাংলা ভাষা হচ্ছে হিন্দুদের ভাষা এই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানীদের মূল উপজীব্য। উর্দূ, যেটি ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রধান ভাষা ছিলো সেটিকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো এই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী অধ্যুষিত অঞ্চলে। বাঙালীর মুসমানিত্বের প্রশ্নে নয়, বরং একই ভাষাভাষী এই রকম একটা সম্প্রদায়ও যদি বিবেচনা করি তবে তার উপর পশ্চিম পাকিস্তানের এই অমার্জনীয় আঘাত কিন্তু শুরুতেই দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তি কিংবা পাকিস্তানের কবর রচনা করে দিয়েছিলো। যে ২৪ টি বছর আমরা পশ্চিমের সাথে ছিলাম সেটি ছিলো আসলে অনেকটা জোর করেই থাকা। আগেই বলেছি ৫২’র ভাষা আন্দোলন খুব স্পস্ট করে দেখিয়ে দিয়েছিলো বিদায়ের রাস্তা। চাপিয়ে দেবার ইচ্ছে ব্যাক্তই নয় বরং জিন্নাহ এই বিষয়কে উপজীব্য করে তার ক্রোধের অনলে হত্যা করেছিলো সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিক সহ নাম না জানা আরো অনেককেই। বাংলাদেশ ভাষার জন্ত, নিজের সংস্কৃতি রক্ষায় রক্ত দিয়ে জানান দিয়েই জানিয়ে দিয়েছিলো ভবিষ্যতের বার্তা।
১৯৪৭ এর দেশ ভাগের পরবর্তী সময়ে খুব সুক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মননশীলতা, প্রগতিশীলতা কিংবা সুস্থ চিন্তার একটা বিশাল ফারাক রয়ে গেছে। শিল্প, সংস্কৃতি কিংবা সাহিত্য চর্চার দিক থেকেও এই ফারাক খুব সুস্পস্ট ছিলো। উপরে এই সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রনোর বক্তব্য তাই খুব তাৎপর্যপূর্ণ।
ধর্মভিত্তিক মুসলমান জাতি সত্তায় শুধু নাম হিসেবেই পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান ছিলো মুসলমান। কিন্তু এই ধর্মের চর্চা, নানাবিধ সংস্কৃতিক চর্চা, ঐতিহ্যের দিক থেকে, চিন্তা, চেতনা কিংবা মননশীলতার ফারাক বিবেচনায় ছিলো যোজন যোজন দূরত্ব। ভাষার উপর পাকিস্তানীদের প্রথম আঘাতেই যেটা স্পস্ট হয়েছিলো যে “হারমোনাইজেশন থিওরী” পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা নিতে অপারগ বরংচ ভাষার উপর হেজিমোনিক অস্ত্রকে ক্ষমতার স্থায়ী সূত্র বলেই তারা মনে করেছিলো।
পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মৌলিক পার্থক্য যা ছিলো সেটি আমার পর্যবেক্ষনে বরাবরই মনে হয়েছে চিন্তা আর দর্শনে। আমাদের এই অঞ্চল, মানে পূর্ব পাকিস্তানের চিন্তা আর চেতনার বিকাশ পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় ছিলো অধিকতর অগ্রগামী। অগ্রগামী বলছি পূর্বের ফিলোসোফিকাল যে দৃষ্টি ভঙ্গি আছে সেটা ছিলো মানবিক এবং অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে এখানে অতিক্রম করবার বাসনাও ছিলো প্রকট। সেটা কিভাবে তা হয়ত সামনে কিছুটা আলোচনা করব। কিন্তু এই যে বলেছি অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা সেটি বলছি প্রাক ১৯০৫ থেকে ৪৭ এর আগ পর্যন্ত যে নানাবিধ বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অভিজ্ঞতা কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের একটা বিস্তার এই আমাদের এইদিকের জনপদকে ঘিরে তীব্র হয়েছিলো সে কথা মাথায় রেখে।
আগেই বলেছি দেশভাগের পর যে স্বপ্ন পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ দেখেছিলো বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনতা সেটি ছিলো অতীতের নানাবিধ ঘটনাক্রমের ফলে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলোন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাষন বিরোধী আন্দোলোন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলোন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলোন, ১৯৬৯ সালের গন অভ্যুত্থান ও ১১ দফা এগুলো আমাদের এই অঞ্চলকে জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে, একটি একক সত্ত্বায় যেমন একত্রিত করেছে তেমনি এসব আন্দলনের ফলে অসাম্প্রদায়িক চেতনারও বিকাশ ঘটেছে সেই পূর্ব অভিজ্ঞতার ফলাফল হিসেবে।
আবার একই সাথে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জাতিসত্বাদের দীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাসও এখানে উল্লেখযোগ্য। চাকমা বিদ্রোহ,সাঁওতাল বিদ্রোহ, হাতি খেদা বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, টংক আন্দোলোন এসব নানাবিধ চড়াই উৎরাই পার হয়েও এই সুনির্দিষ্ট এলাকার অধিবাসীরাও যোগ দেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টিতে। সক্রিয় হন মুক্তিযুদ্ধে। দুইটি ধর্মের একসাথে থাকবার সময়ও যে বঞ্চনার শিকার এই জনপদের মানুষেরা প্রত্যক্ষ করেছে এবং সেটির সমাপ্তি প্রকল্পে দেশ ভাগের সারকথা যখন ব্যার্থতায় পর্যবসিত হোলো তখন উপলব্ধিটুকু আমাদের যা হয়েছে তা হচ্ছে সাম্যের, সংহতির এবং পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যায়গা থেকে সহবস্থান।
ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে গঠিত পাকিস্তানের এই ভীষন ব্যার্থতা এই অঞ্চলের মানুষদের মানসিকতায় এটি সুনিশ্চিতভাবে নির্ধারিত করে দিলো যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাই আসলে পারে মুক্তি দিতে। উপলব্ধির যায়গা থেকে বাঙালী এই দর্শনকেই বরং তাদের চেতনায় ঠাঁই দিয়েছে। এটা এমন একটা দর্শন যেটা আসলে আরোপিত নয় বরং অতীতের ব্যার্থতাগুলোর ফলে এক ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা যে আসলে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিলো সেটি মূলত নানাভাবে আমাদের সামনে আসছিলো ঐতিহাসিক ঘটনাকে আরো গভীরভাবে বিবেচনা করেই আর সেগুলোতে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের সু-স্পস্ট ঘোষনা রয়েছে। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বাংলাদশের চরিত্র হিসেবে থাকবার যে প্রবণতা এটা কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়। এটা সম্মলিত মানুষের যৌথ চিন্তা।
এই চিন্তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিংবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্ফুটিত হবার একমাত্র পথ ছিলো শায়ত্বশাষনের মাধ্যমে আত্ননিয়ন্ত্রনের অধিকার আদায়ের পরবর্তী পথ পরিক্রমায়। ধর্মের ভিত্তিতে ও সে চিন্তায় একটি রাষ্ট্রের পুরো গঠন প্রণালী-ই যে মূলত ব্যার্থ তখন এই জনপদের মানুষেরা সেটি কার্যত অনুভব করতে পেরেছিলো। ২৩ বছরের পাকিস্তানী সামরিক শাষকদের ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের শাষনে পূর্ব পাকিস্তান এতটাই ভঙ্গুর অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলো যেখানে ধর্ম হয়েছিলো এক নগন্য প্রকরনের নাম। ধর্মের চিন্তা ক্রমশই এই অংশের জনতা সীমাবদ্ধ রেখেছে পরলৌকিক নিজস্ব চিন্তাতে ও উপাসনালয়ে। এটির প্রভাব যে রাজনীতিতে কিংবা নিজের প্রাপ্ত অধিকারের ক্ষেত্রে একেবারেই শূন্য এবং এই ধারনার মূল উপাদানগুলোই যে আসলে অকার্যকর তা বাংলাদেশীরা অনুধাবন করেছিলেন পাকিস্তান গঠিত হবার ২৪ বছর ধরে।
মূলত ধর্ম যে এই পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাষক আর তাদের পোষ্য রাজনীতিবিদদের একটি কূট চাল ও ক্ষমতাকে ধরে রাখবার কৌশল সেটিও ধীরে ধীরে প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু এখানে এটিও বলে রাখা ভালো যে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানেই নয় বরং এই পূর্ব পাকিস্তানেও কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যাক্তি ছিলো এই সামরিক শাষকদের তল্পিবাহী যারা সব সময় পূর্ব পাকিস্তানের এই সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার বিরোধী ছিলো। এই জন্য তারা মূলত দায়ী করত আওয়ামীলীগ কে এবং তারা এও মনে করত যে আওয়ামীলীগ হচ্ছে ভারতের হাতের এক রাজনৈতিক গুটি যারা পাকিস্তানুকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে বদ্ধ পরিকর।
এই সুনির্দিষ্ট ভাবনার ধারন ও বাহক ছিলো খন্দকার মোশতাক যিনি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচরকে স্বপরিবারে হত্যা করবার পর তার রাজনৈতিক সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকেও জেলের মধ্যে হত্যা করেছে অথচ ক্ষমতার ৮৩ দিনে তার এবং সহযোগীদের মুখ দিয়ে শুধু বের হয়েছে ধর্মের কথা। উপরে যে বলেছি এই অঞ্চলের মানুষ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারে ত্যাক্ত ও বিরক্ত ছিলো তা বোধকরি আংশিক সত্য। কেননা যদি এই বিরক্তি সার্বজনীনই হতো তাহলে খুন করে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের সাহস হয়ত কেউ করতে পারতোই না। কিন্তু এই আংশিক ব্যবহার করা হয়েছে যেই ‘রাজনৈতিক ভোক্তাদের’ উপর তাঁরা কি এই হত্যার ম্যান্ডেট দিয়েছিলো নাকি তাদের মৌনতা ছিলো ভয় আর আতংকের ফলে? এই বিষয়টা হয়ত অনেক বেশী বিতর্কের কেননা ভোক্তা না থাকলে খুনী খুন করবার পর ধর্মকে ব্যবহার করাটা প্রয়োজনীয়-ই মনে করতো না।
১৫ই অগাস্টের রক্তাক্ত অধ্যায়ের পর ক্ষমতা গ্রহণের পরেই খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পদটি বিলুপ্ত করে এবং নিজেই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পাশাপাশি নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষনা করে এবং উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ করে বঙ্গবন্ধু সরকারের ক্যাবিনেটের ভূমিমন্ত্রী মোহাম্মদ উল্লাহকে। একই সাথে মোশতাক তার ক্যাবিনেটে ১২ জন মন্ত্রী এবং ১১ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করে যাদের অধিকাংশ-ই বঙ্গবন্ধু সরকারের ক্যাবিনেটে ছিলো। মোশতাকের জারি করা সেই সামরিক আইনের পূর্ণাঙ্গ লিপিটি পাঠকদের জানার ও বুঝবার প্রয়োজনে নীচে ইংরেজী ও বাংলা দুই ভাষাতেই উল্লেখ করছি-
“Whereas I, Khandaker Moshtaque Ahmed, with the help and mercy of the Almighty Allah and relying upon the blessings of the people, have taken over all and full powers of the Government of the People’s Republic of Bangladesh with effect from the morning of the 15th August, 1975.
And whereas I placed, on the morning of the 15th August, 1975 the whole of Bangladesh under Martial Law by a declaration broadcast from all stations of Radio Bangladesh;
And whereas, with effect from the morning of the 15th August,
1975, I have suspended the provisions of article 48, in so far as it relates of election of the President of Bangladesh, and article 55 of the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, and modified the provisions of article 148 thereof and form I of the Third Schedule thereto to the effect that the oath of office of the President of Bangladesh shall be administered by the Chief Justice of Bangladesh and that the president may enter upon office before he takes the oath;
Now, thereof, I, Khandaker Moshtaque Ahmed, in exercise of all powers enabling me in this behalf, do hereby declare that-
(a) I have assumed and entered upon the office of the President of Bangladesh with effect from the morning of the 15th August, 1975;
(b) I may make, from time to time, Martial Law Regulations and Orders-
- Providing for setting up Special Courts or Tribunals for the trial and punishment of any offence under such Regulations or Orders or for contravention thereof, and of offences under any other law;
- Prescribing penalties for offences under such Regulations or Orders or for contravention thereof and special penalties for offences under any other law;
- Empowering any Court or Tribunal to try and punish any offence under such Regulation or Order or the contravention thereof;
- Barring the jurisdiction of any Court or Tribunal from trying any offence specified in such Regulations or Orders;
(c) I may rescind the declaration of Martial Law made on the morning of the 15th August, 1975, at any time, either in respect of the whole of Bangladesh or any part thereof, and may again place the whole of Bangladesh or any part thereof under Martial Law by a fresh declaration;
(d) this Proclamation and the Martial Law Regulations and Orders made by me in pursuance thereof shall have effect notwithstanding anything contained in the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh or in any law for the time being in force;
(e) The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh shall, subject to this Proclamation and the Martial Law Regulations, and Orders made by me in pursuance thereof, continue to remain in force;
(f) all Acts, Ordinance, President’s Orders and other Orders, Proclamations rules, regulations, bye-laws, notifications and other legal instruments in force on the morning of the 15th August, 1975, shall continue to remain in force until repealed, revoked or amended ;
(g) no Court, including the Supreme Court, or tribunal or authority shall have any power to call in question in any manner whatsoever or declare illegal or void this Proclamation or any Martial Law Regulation or Order made by me in pursuance thereof, or any declaration made by or under this Proclamation, or mentioned in this Proclamation to have been made, or anything done or any action taken by or under this Proclamation, or mentioned in this Proclamation to have been done or taken, or anything done or any action taken by or under any Martial Law Regulation or Order made by me in pursuance of this Proclamation ;
(h) I may, by order notified in the official Gazette, amend this
Proclamation.
বাংলা অনুবাদ-
(Proclamation), ২০শে আগষ্ট ১৯৭৫
যেহেতু আমি, খন্দকার মোস্তাক আহমদ, সর্বশক্তিমান আল্লাহ সহায়তা ও করুণায় এবং জনগণের দোয়ার উপর নির্ভর করিয়া ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের প্রাতঃকাল হইতে কার্যকর করিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সকল ও পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছি;
এবং যেহেতু আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের প্রাতঃকালে রেডিও বাংলাদেশের সকল কেন্দ্র হইতে প্রচারিত এক ঘোষণা বলে সমগ্র বাংলাদেশে সামরিক আইন জারী করিয়াছি;
এবং যেহেতু আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের বিধান—যতখানি তাহা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সহিত সংশ্লিষ্ট ততখানি ২৩…..] ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের প্রাতঃকাল হইতে স্থগিত রাখিয়াছি, এবং উক্ত সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের বিধানাবলীকে ও উক্ত অনুচ্ছেদের সহিত সংশ্লিষ্ট তৃতীয় তফসিলের ১নং ফরমকে এই মর্মে পরিবর্তন (যে পরিবর্তন উক্ত তারিখের প্রাতঃকাল হইতে কার্যকর হইবে) করিয়াছি যে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি কর্তৃক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির শপথপাঠ পরিচালিত হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাঁহার শপথগ্রহণের পূর্বেই কার্যভার গ্রহণ করিতে পারিবেন;
সেহেতু, এক্ষণে, আমি খন্দকার মোশতাক আহমদ এতদুদ্দেশ্যে আমাকে প্রদত্ত সকল ক্ষমতাবলে এতদ্বারা ঘোষণা করিতেছি যে-
(ক) আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের প্রাতঃকাল হইতে কার্যকর করিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ ও কার্যভার গ্রহণ করিয়াছি;
ক(ক) যদি আমি কোন কারণে রাষ্ট্রপতির পদের দায়িত্বপালনে অসমর্থ হই, বা যদি আমি রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করিতে চাহি, তাহা হইলে আমি আদেশ বলে যে কোন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে মনোনীত করিয়া তাঁহার নিকট রাষ্ট্রপতির পদ হস্তান্তর করিতে পারিব, এবং তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বা আমা-দ্বারা নির্ধারিত সুপ্রীম কোর্টের যে-কোন বিচারকের সমক্ষে প্রয়োজনীয় শপথ গ্রহণ করিবার পর উক্ত পদে আসীন হইবেন;
(খ) আমি সময়ে সময়ে [অন্যান্যের মধ্যে সামরিক আইন প্রবিধান ও আদেশসমূহ] প্রণয়ন করিতে পারিব এবং ইহাদের দ্বারা—
(১) এইরূপ প্রবিধান বা আদেশসমূহের অধীনে কৃত কোন অপরাধের জন্য বা উহাদের লংঘনের জন্য বা অন্য কোন আইনের অধীনে কৃত কোন অপরাধের জন্য বিচার ও শাস্তিদানের উদ্দেশ্যে বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান করা যাইবে;
(২) এইরূপ প্রবিধান বা আদেশসমূহের অধীনে কৃত কোন অপরাধের জন্য বা উহাদের লংঘনের জন্য শাস্তি এবং অন্য কোন আইনের অধীনে কৃত কোন অপরাধের জন্য বিশেষ শাস্তি নির্দেশ করা যাইবে;
(৩) এইরূপ প্রবিধান বা আদেশসমূহের অধীনে কৃত কোন অপরাধ বা ইহাদের লংঘনের বিচার ও শাস্তিদানের ক্ষমতা যে-কোন আদালত বা ট্রাইব্যুনালকে প্রদান করা যাইবে;
(৪) এইরূপ প্রবিধান বা আদেশসমূহে সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত কোন অপরাধের বিচার করিবার ক্ষমতা প্রয়োগ করা হইতে যে-কোন আদালত বা ট্রাইব্যুনালকে নিবৃত্ত করা যাইবে;
(৫) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত, বা উক্ত সংবিধানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা উক্ত সংবিধানে যাহা সম্পর্কে বিধান করা হইয়াছে এমন যে কোন বিষয়সহ অন্য যে কোন বিষয়ে বা বিষয় সম্পর্কে বিধান নির্দেশ করা যাইবে;]
(গ) আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের প্রাতঃকালে ঘোষিত সামরিক আইনকে যে কোন সময়ে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য বা ইহার অংশবিশেষের জন্য প্রত্যাহার করিতে পারিব, এবং কোন নূতন ঘোষণার দ্বারা সমগ্র বাংলাদেশে বা ইহার অংশবিশেষে পুনরায় সামরিক আইন বলবৎ করিতে পারিব;
(ঘ) এই ফরমান এবং এই ফরমান অনুসারে আমা-দ্বারা প্রণীত সামরিক আইন প্রবিধান ও আদেশ ও অন্যান্য আদেশ] গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বা সাময়িকভাবে বলবৎ এমন যে কোন আইনে যে কোন কিছু থাকা সত্ত্বেও কার্যকর হইবে;
(ঙ) এই ফরমান ও এই ফরমান অনুসারে আমা-দ্বারা প্রণীত সামরিক আইন প্রবিধান ও আদেশ ও অন্যান্য আদেশ] সাপেক্ষে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান বলবৎ থাকিবে;
(চ) ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের প্রাতঃকালে বলবৎ ছিল এমন সকল আইন, অধ্যাদেশ, রাষ্ট্রপতির আদেশ ও অন্যান্য আদেশ, ফরমান, বিধি, প্রবিধান, উপ- আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল রহিত, প্রত্যাহৃত বা সংশোধিত না হইলে বলবৎ থাকিবে;
(ছ) এই ফরমান বা এই ফরমান অনুসারে আমা-দ্বারা প্রণীত কোন সামরিক আইন প্রবিধান বা আদেশ ৩১[বা অন্য আদেশ], অথবা এই ফরমানের বলে বা অধীনে প্রণীত বা প্রণীত হইয়াছে বলিয়া এই ফরমানে উল্লিখিত এমন কোন ঘোষণা, অথবা এই ফরমানের বলে বা অধীনে কৃত কোন কার্য বা গৃহীত কোন ব্যবস্থা অথবা এইভাবে কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া এই ফরমানে উল্লিখিত এমন কোন কাৰ্য বা ব্যবস্থা, অথবা এই ফরমান অনুসারে আমা-দ্বারা প্রণীত কোন সামরিক আইন প্রবিধান বা আদেশ ৩১[বা অন্য আদেশ] বলে বা ইহার অধীনে কৃত কোন কার্য বা গৃহীত কোন ব্যবস্থা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন তোলা বা ইহাকে অবৈধ বা বাতিল বলিয়া ঘোষণা করিবার ক্ষমতা সুপ্রীম কোর্ট বা অন্য কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের থাকিবে না ।
(জ) আমি সরকারী গেজেটে বিজ্ঞাপিত আদেশবলে এই ফরমান সংশোধন করিতে পারিব।
মোশতাক তার এই সামরিক ফরমানের শুরুতেই যে কথাগুলো উল্লেখ করে সেটিকে ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার এবং সুস্পস্ট মিথ্যাচার-ই আসলে বলা যেতে পারে। লক্ষ্য করে দেখুন মোশতাক প্রথম অংশে বলছে, ‘with the help and mercy of the Almighty Allah’ বাক্যটি। দেশে বিদ্যামান রাষ্ট্রপতি, তাঁর পরিবার এবং অন্যান্য মন্ত্রী ও তাঁদের পরিবার, রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষদের হত্যা করে অবৈধ ক্ষমতা দখলের পুরো বিষয়টি ধর্মকে টেনে এনে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছে মোশতাক। যার স্পস্ট মানে দাঁড়ায় এই পুরো হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে আল্লাহ এবং তাঁরই সাহায্যে সে এই ফরমান ঘোষনা করছে। একই ভাবে দ্বিতীয় অংশটুকু বাংলাদেশের জনতার সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
করে খন্দকার মোশতাক নিজেই নিজেকে প্রধান সামরিক প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি ঘোষনা করেন এবং সেটি করতে গিয়ে তিনি তার সমর্থনে প্রথমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অংশ হিসেবে (১)‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ’ বলে পবিত্র ধর্মকে নিজের মত করে ব্যবহার করেন এবং (২) কূটচালের রাজনীতি হিসেবে ‘বাংলাদেশের জনতার আশীর্বাদ ও তাদের উপর নির্ভর করে’ এই বাক্যটি বলে সাধারন জনতাকেও এই হত্যাকান্ডের অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তার এই অবৈধ ক্ষমতা দখলকে আইনসম্মত করবার প্রয়াস নেন। মোশতাকের এই ধর্ম ব্যবসা এখানেই আসলে শেষ হয়ে যায়নি।
এই হত্যাকান্ডের পুরো প্রক্রিয়ার পর মোশতাক সেদিন রক্তাত হাতে দুপুরে জুম্মার নামাজ পড়তে যান এবং পাকিস্তানী আদলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শব্দদ্বয়কে তিনি তার সামরিক ফরমানে উল্লেখ করেন। যে লোকটি আগের দিন পর্যন্ত বলেছিলো মুক্তিযুদ্ধের অমোঘ স্লোগান ‘জয় বাংলা’, সেই লোকটি বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এই বাংলাদেশেই চালু করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ রাজনীতি। ‘বাংলাদেশ বেতার’ ‘রেডিও পাকিস্তানের’ আদলে ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায় ‘রেডিও বাংলাদেশ’।
মোশতাক তার সামরিক ফরমানে এই যে ধর্মের ব্যবহার করেছিলো ধারনা করা যায় এটি ছিলো এই হত্যাকান্ডের পূর্ব পরিকল্পনারই একটি অংশ। হত্যাকান্ডের আগেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশ বেতার দখলের দায়িত্ব অর্পিত হয় এই হত্যাকান্ডের অন্যতম কুশীলব শরিফুল ইসলাম ডালিমের ওরফে মেজর ডালিমের ওপর। বেতার দখলের পর জনসাধারনের উদ্দেশ্যে যে ভাষন বাংলাদেশে বেতার থেকে প্রথমে দেয়া হয় সেখানে তিনি প্রথম ঘোষনাতে বাংলাদেশকে ইসলামী রিপাবলিক হিসেবে ঘোষনা দেন[3] একই তথ্য পাওয়া যায় ১৯৮৫ সালে বাচ্চু রহমানের লেখা ‘Late Night Massacre’ বইতে, যেখানে তিনি লিখেন- ‘An American news agency reported the massacre within minutes of the coup. It said that Bangladesh became an Islamic Republic. Complete reversal? Radio Pakistan Too, said, quoting an anonymous diplomatic source, Bangladesh now is an Islamic Republic’[4]
১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক বিচিন্তার সাথে সাক্ষাৎকারে মোশতাকই বলে-
মোশতাকই- …এমন একটা জটিল প্রশ্ন করে দিয়েছেন যে সোঁটা বললে (অনেকক্ষণ চুপ) নিজের কথা বলা হয়ে যাবে। এখানে আমি এটা উল্লেখ করতে চাই- ডঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায় ‘ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেশে দেশে গ্রন্থে এটা লিখেছেন। সেখানে আমি বলেছি- আই সেইভ দ্যা নেশন, অই সেইভ দ্যা ন্যাশন ফ্রম এ সিভিল ওয়ার, দেয়ার ওয়াজ নট ও সিঙ্গেল বুলেট অজ ফায়ারড়, নট ও ড্রপ ব্লাড ওয়ার সেন্ড। আমার আগে স্বাধীনতা অপূর্ণ ছিল। চায়নার মত দেশ স্বীকৃতি দেয়নি, সৌদী আরবের মত দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। এই দুটোই আমার সময়ে স্বীকৃতি দিয়ে অপূর্ণ স্বাধীনতাকে পূর্ণতা দিয়েছে।
এ কৃতিত্ব আমার সরকারের দাবী সেটা স্বীকৃত দাবী। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্ম ইসলামকে বাদ দিয়ে রাজনীতি সম্ভব নয় তাই তাদের মত গণতান্ত্রিকভাবে স্বীকৃতি দেই ‘বিসমিল্লাহির রাহমানের বাহিম আসসালামুয়ালাইকুম’ ‘খোদা হাফেজ’ ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ এই চারটা দিয়ে।[5] কিন্তু প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে মোশতাক এটা বলেনি যে গণতান্ত্রিকভাবে এই সিদ্ধান্ত দেবার প্রক্রিয়াটা তার কি ছিলো। এক রাতে দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে রক্তের উপর দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতায় যাবার নামই মোশতাকের দৃষ্টিতে ছিলো ক্ষমতায় যাওয়া আর এই সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত ছিলো তার কথিত ‘গণতান্ত্রিক ভাবে স্বীকৃতি’।
ধর্মের এই রাজনৈতিক ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া যায় ১৯৮৬ সালে সাপ্তাহিক মেঘনাকে দেয়া মোশতাকের আরেকটা সাক্ষাৎকারে।[6] তিনি অত্যন্ত গর্ব নিয়ে বলে তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনের পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের প্রাক্কালে সবাইকে সালাম দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন, বিসমিল্লাহ বলেন এবং শেষ করেন ‘খোদা হাফেজ’ দিয়ে। ব্যাপারটা এমন যে এই শব্দগুলো তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন চালু করেছিলেন আর আগে কেউ কখনো শোনেনি। অথচ ঐতিহাসিক ৭-ই মার্চের ভাষনে বঙ্গবন্ধু ‘ইনশাল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন একজন মুসলিম হিসেবে তাঁর স্বাভাবিক চর্চার অংশ হিসেবে, ধর্ম ব্যবসার কারনে নন। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামীলীগের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের ভাষন-বক্তৃতার ক্ষেত্রে যেখানে বক্তব্যের শুরুতে একজন মুসলমান হিসেবে তাঁর ধর্ম অনুযায়ী বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করতে। কিন্তু মোশতাকের এই সুনির্দিষ্টভাবে এই ‘বিসমিল্লাহ’, ‘খোদা হাফেজ’, ‘আসসালামুয়ালাইকুম’ এই শব্দগুলোর বিষয়ে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে বারবার বলবার উদ্দেশ্য হচ্ছে মোশতাকই এই শব্দগুলোর ব্যবহার করেছে রাজনীতিতে ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবার উদ্দেশ্যে। স্বাভাবিক ধর্ম চর্চা আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার এই দুইয়ের ভেতর একটা সুস্পস্ট পার্থক্য রয়েই যায়।
অবশ্য ইসলামিক প্রজাতন্ত্র না করবার পেছনেও মোশতাকের যে চাতুর্য্য সেটা বুঝতে পারা যায় তার রাজনীতি খানিকটা পর্যবেক্ষন করলেই। মোশতাক ‘অখন্ড পাকিস্তানে’ বিশ্বাসী একজন মানুষ ছিলো এতে করে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে মোশতাকের অবস্থা হয়েছিলো এমন যে, সেই সময় টিকে থাকার জন্য তার জন্য ভারতের সমর্থন ছিলো অতি জরুরী। মোশতাক জানতো ভারতের সাথে ২৫ বছরের সামরিক চুক্তি অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশে এই অবৈধ সরকারকে যে কোনো সময় গদিচ্যুত করতে পারে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে ফলে মোশতাকই তার ধর্ম বিশ্বাসের আগে ক্ষমতা বিশ্বাসকেই তার প্রধান ধর্ম বলে জ্ঞান করেছিলো। আমরা কথ্য ভাষাতে যেটিকে বলে ‘বেঁচে থাকলে বাপের নাম’।
আবার একটি কথাও এখানে খুবই সত্য যে মোশতাকই ছিলো অতি মাত্রায় আমেরিকাপন্থী একজন মানুষ। একদিকে আমেরিকার প্রতি প্রবল আস্থা অন্যদিকে বিশ্বাসের যায়গায় পাকিস্তানী আদর্শ আর টিকে থাকার জন্য ভারতের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এই তিনটি মিলিয়ে মোশতাকের চাতুর্য্য ছিলো দেখবার মতন। আবার এসব সব ছাপিয়ে চীনের আস্থা অর্জন এবং মধ্যাপ্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলোকে এটি অনুধাবন করানো যে বাংলাদেশ আদতে একটি ইসলামিক দেশ এবং এখানে ইসলাম ধর্মের আধিপত্যই বহাল রয়েছে। নিজের বিশ্বাস আর ‘কায়দা করে’ টিকে থাকবার এই যে সমীকরণ সেটির একটা যথার্থ রূপ মোশতাকের এই ৮৩ দিনের শাসন আমলের উল্লেখযোগ্য একটি দিক। খতিব তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে মোশতাকই ন্যাপের মোজাফফর আহমেদকে জানিয়েছে যে রেডিও স্টেশনে মেজররা তাকে ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে বাংলাদেশকে ঘোষনা দিতে বলবার পরেও তিনি তাদেরকে ‘আওয়ামীলীগের মিছিল রেডিও স্টেশনের দিকে ধেয়ে আসছে’ এই বলে ধৈর্য্য ধরতে এবং এখনও সময় হয়নি এই অযুহাতে তখন পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যান।[7]
এই যায়গা থেকে মোশতাকের মানসিক গড়নের একটা উদাহরন লক্ষ্য করা যায়। মোশতাকই তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে যখনই তার আশা অনুযায়ী ফললাভে ব্যার্থ হয়েছেন সাথে সাথেই তিনি তা পুষে রেখে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং তার চৌহদ্দী অনুযায়ী কতটা এগুতে পারবেন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন। এসব তিনি সব সময় করেছেন এই ‘টিকে থাকার’ সূত্রে। অর্থ্যাৎ এই চতুর লোকটি এটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে নিজের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও ক্ষমতায় থাকতে পারাটা প্রাথমিকভাবে জরুরী আর সে কারনেই তাকে অনেক অপ্রিয় অবস্থার মুখোমুখি হতে হলেও ক্রোধ সংবরণ করে তিনি তা মেনে নিয়েছেন পরবর্তী লক্ষ্য পুরণের আশায়।
মোশতাক এটা অনুধাবন করতে পেরেছিলো যে বাংলাদেশ একটি সেক্যুলার প্রগতিশীল সমাজ গঠনের প্রচন্ড আকাঙ্ক্ষায় তৈরী হওয়া রাষ্ট্র। এই অধ্যায়ের শুরুতেই এর দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে চট করেই জাতি রাষ্ট্রের এই খোল-নলচা পালটে ফেলবার প্রশ্নে মোশতাক একদিক থেকে যেমন ছিলো সতর্ক অন্যদিকে তার শংকাও ছিলো। এই শংকা যেমন ছিলো বাংলাদেশের প্রগতীশীল জনতার তেমনি ভয় ছিলো ভারতের তরফ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়ার। এইসব ভয় অনেক সময় খালিচোখে মনে হতে পারে অমূলক কিন্তু সেটিকে যে উড়িয়ে দেয়া যায়না সেটাও সঠিক। তবে মোশতাকই যে তার বিশ্বাসে অটল থাকার মত ব্যাক্তিত্ববান কেউ ছিলেন না সেটি তার পূর্বতন রাজনৈতিক জীবনের বর্ণনাতে পরিষ্কার।
ফলে একদিকে মনের ভেতরে ধর্মের আবরণে রাষ্ট্রকে মুড়িয়ে দেবার খায়েশ আর অন্যদিকে পশ্চিমের সাথে সংযোগ রক্ষা করবার কাতরতা মোশতাককে ধোপার সেই বহুল কথ্য প্রানীটির সাথে এক মকাতারে এনেছে। যার না আছে ঘর, না রয়েছে ঘাট। মোশতাকের চরিত্র ছিলো অনেকটা ‘পারসেপশান’ তৈরী করবার মধ্যে জয়ে অনুধাবন করবার কিংবা তৃপ্তি পাবার মধ্যে। অর্থ্যাৎ নিজেকে ধার্মিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করা, ধর্ম থেকে বিচ্যুত কেউ নন, অন্যের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে এমন করে নিজেকে প্রকাশ করবার। শেখ মুজিবুর রহমানকে পুরো পারিবারসুদ্ধ হত্যা কিংবা জাতীয় চার নেতাকে জেলের ভেতর হত্যা করার পরেও মোশতাকের চারপাশের চাটুকার শ্রেণী জনমানসে এটি বুঝিইয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে তিনি এই হত্যা পরিকল্পনার কথা কিছুই জানতেন না ঘটনার দিন সকাল ছাড়া কিংবা বঙ্গবন্ধুর লাশকে টুঙ্গিপাড়ায় পাঠিয়ে দিয়ে ধর্মীয় মতে সৎকার করবার ব্যবস্থা করার মধ্যেও মোশতাকই অভিনন্দিত হতে চেয়েছিলেন।
এ এল খতিব তাঁর গ্রন্থে[8] এই বিষয়টা উল্লেখ করে বলেন যে খন্দকার মোশতাকের অনুগতরা তার সহকর্মী ও দেশবাসীকে নানাভাবে এতা বুঝাতে চেয়েছিলো যে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হবে বলে মোশতাকই জ্ঞাত ছিলোনা এবং হত্যার পর তাকে পূর্ণ সম্মান দেখিয়ে সমাহিত করা হয়েছিলো। অর্থ্যাৎ মোশতাকই যেই পথে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলো সেটির কালিমা সম্পর্কে যে সম্যক অবগত ছিলো ফলে সেটিকে সে যথাসম্ভব বিশ্বাসযোগ্য বলে মানুষের কাছে উপস্থাপন শুরু করেছিলো। অথচ এই ক্ষমতা লাভের যে পথ সেটিকেও সে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলো পরম নিষ্ঠায়।
অবশ্য শুধু মোশতাকই নয় বরং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জড়িত খুনীরাও এই হত্যার পর ধর্মের ব্যবহার করতে ছাড়েনি। এন্থনী মাসকারেনহাসে’র, বাংলাদেশঃ লেগেসি অফ ব্লাড বইতেও এই হত্যাকান্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারী লে কর্ণেল ফারুক রহমান লেখকের কাছে উল্লেখ করেন যে তিনি একটি ‘পবিত্র’ দিন দেখে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটাতে চেয়েছেন সে কারনেই শুক্রবার দিন (১৫-ই অগাস্ট ১৯৭৫) তিনি বেছে নিয়েছেন কেননা শুক্রবার দিনটা তার জন্য পবিত্র। ফারুক হত্যাকান্ডের আগে চট্টগ্রামে সে সময় বসবারত বিহারী নাগরিক ‘আন্ধা হাফিজ’ নামের এক কথিত পীরের থেকেও অনুমতি নিয়েছেলেন।[9]
ঐ একই গ্রন্থে তিনি বলেছেন শুক্রবার তার জন্য পবিত্র দিন কেননা এইদিনে ফারুক আজানের সময় জন্ম নিয়েছিলো এবং তার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও ঘটেছিলো এই শক্রবারে[10] ফারুক রহমান অবশ্য পরবর্তী সময় যখন ‘ফ্রিডম পার্টি’ নামের একটা রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করলেন সে সময় তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তিনি বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বানাতে চান এবং সেটা তার নিজস্ব মডেলে।[11] ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোশনার কথাটি উঠে আসে ১৫-ই অগাস্টের দিন তৎকালীন মার্কিন ক্যাবিনেট সেক্রেটারী হেনরী কিসিঞ্জারের সাথে বাকি কর্মকর্তাদের সাথে সভার একটি উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া নথিতে। যেখানে কিসিঞ্জারকে; আলফ্রেড আথারটন জানান যে ঘাতকেরা ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষনা করেছে।[12] এই তথ্যের আরো প্রমাণ পাওয়া যায় এন্থনি মাসকারেনহাসের বইতেও।[13] একইভাবে মেজর ডালিম তার লিখিত গ্রন্থ ‘যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি’ নামক গ্রন্থে হত্যাকান্ডের ঠিক পর পর কিছু ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন-
‘অপারেশন শেষ। রেডিওতে সরকার পতন ও শেখ মুজিবের নিহত হবার খবর ঘোষিত হয়েছে। আমি কিছু জরুরী কাজে ব্যস্ত ছিলাম; হঠাৎ ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার এসে জানাল রক্ষীবাহিনীর তিনটি ট্রাক ও একটি জিপ টিএসসি-র দিক থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম এরা রক্ষীবাহিনীর টহলদার ইউনিট। শেখ মুজিবের বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষ্যে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে শেখ মুজিবের মৃত্যু সংবাদ যদি শুনে থাকে তবে তাদের প্রতিক্রিয়া বিরূপ হওয়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে সংঘর্ষ অনিবার্য। আর যদি না শুনে থাকে তবে তাদের খবরটা জানিয়ে তাদের সমর্থন আদায় করার চেষ্টা করতে হবে। কয়েক মুহুর্ত চিন্তা করে শাহরিয়ারকে বললাম, “আমি ওদের মনোভাব ও প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য যাচ্ছি। ওদের সমর্থন না পেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবার জন্য তুমি তৈরি থেকো।” জিপ চালিয়ে একাই বেরিয়ে এলাম গেট দিয়ে। পিজি হাসপাতাল এর সামনে পৌঁছতেই দেখলাম কনভয়টি পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে এসে থেমেছে। আমি জিপ থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম জিপে বসে আছে রক্ষীবাহিনীর একজন লিডার। লিডার আমাকে দেখে গাড়ি থেকে নেমে স্যালুট করে দাঁড়াল।
– তোমরা এখানে কি করছ? প্রশ্ন করলাম।
– আমরা টহল দিচ্ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। গোলাগুলির শব্দ শুনে এদিকে এসেছি। জবাব দিল লিডার। বুঝলাম ওরা বিপ্লব ও মুজিবের মৃত্যুর খবরটা এখনও শোনেনি। লিডার জিজ্ঞাসা করল,
– ব্যাপার কি স্যার? বললাম,
– শেখ মুজিবের সরকারের পতন ঘটিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শেখ মুজিব মারা গেছেন বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানে। এ পরিস্থিতিতে তোমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তোমরা এই পরিবর্তনের পক্ষে না বিপক্ষে। অল্পক্ষণ চিন্তা করে লিডার বলল,
– আমরা পরিবর্তনের সপক্ষে। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। ট্রুপসদের গাড়ি থেকে নামিয়ে তাদের সমস্ত ঘটনা খুলে বলে তাদের মতামত জানতে চাইলে সবাই একবাক্যে পরিবর্তনকে সমর্থন জানাল। এরপর সবাইকে সাথে নিয়ে ‘নারায়ে তাকবির। আল্লাহু আকবর’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘সিপাই সিপাই ভাই ভাই’ প্রভৃতি শ্লোগান দিতে দিতে রেডিওতে ফিরে এলাম। রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে বুঝেছিলাম, ওদের সর্ম্পকে আমাদের মূল্যায়ন ছিল নির্ভুল’[14]
এই পুরো ঘটনাগুলোকে এক করে পাশাপাশি রেখে দেখলে এটা বলা যায় যে সামরিক ফরমান জারির ক্ষেত্রে ধর্মকে উপজীব্য করা এবং সেটিকে কেন্দ্র করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বানাবার যে পরিকল্পনা সেখানে যেমন হত্যাকান্ডের পর ধর্মের নিরাপদ আবরণের নীচে নিজেদের সমর্পিত করে এই মুসলিম অধ্যুষিত দেশে সাধারণ জনতার কাছে ‘সঠিক’ থাকা অন্যদিকে সাধারন জনতা এই হত্যাকান্ডের সমর্থনে রয়েছে ও তাদের আশীর্বাদ এই ঘটনায় রয়েছে এটিকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই ঘটনাটির-ই সম্পুরক বর্ধিত অংশ হিসেবে বলা যায় যে ১৫-ই অগাস্টের হত্যাকান্ডের চূড়ান্ত সুবিধা যিনি ভোগ করেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের যিনি অন্যতম সাহায্যকারী ও পরিকল্পনাকারী[15][16]
সেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তিনি কিন্তু প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি (১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ২১ শে এপ্রিল) হিসেবে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধানের ভেতর ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বাক্যটি ঢুকিয়ে দেন। (ফরমান নাম্বার)। এই ঘটনার সাথে এটিও বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ১৫-ই অগাস্টের এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের পরপর-ই পাকিস্তান, সৌদি আরব, সুদান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সৌদি আরব শুধু স্বীকৃতিই দেয়নি বরং কিছুটা আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে’ আখ্যায়িত করে শুভেচ্ছাও জানান।[17] এবং তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশ সরকারের ‘উচ্ছাসিত’ তারবার্তা প্রেরণ করেন। একই সাথে ৫০ টন চাল, ১০ মিলিয়ন ইয়ার্ডস লম্বা থান কাপড় সহ অন্যান্য দ্রবাদি প্রেরণ করেন। এই বিষয়ে মার্কিন অবমুক্ত হওয়া নথি থেকে জানা যায় যে[18]–
‘E.O. 11652: GDS
TAGS: PFOR, PK, BG
SUBJECT: INITIAL GOP REACTION TO BANGLADESH COUP
- PRIME MINISTER BHUTTO’S STATEMENT ANNOUNCING RECOGNITION OF NEW BANGLADESH GOVERNMENT WAS RELEASED TO PRESS AT ABOUT 2300 LOCAL TIME, SHORTLY AFTER FOREIGN SECRETARY AGHA SHAHI HAD INFORMED AMBASSADOR OF DECISION.
- TEXT, CERTAINLY WARMEST GOP HAS EVER SENT TO DACCA, DIFFERS SOMEWHAT FROM THAT PASSED TO DEPARTMENT BY PAK EMBASSY WASHINGTON (STATE 194773 NOTAL). IT READS AS FOLLOWS:
“AS A FIRST AND SPONTANEOUS GESTURE TO THE FRATERNAL PEOPLE OF BANGLADESH, I HAVE DECIDED TO IMMEDIATELY DISPATCH TO BANGLADESH AS A GIFT FROM THE PEOPLE OF PAKISTAN 50,000 TONS OF RICE, 10 MILLION YARDS OF LONG CLOTH AND FIVE MILLION YARDS OF BLEACHED MULL. THIS IS ONLY A MODEST CONTRIBUTION OF OUR PEOPLE.
CONFIDENTIAL’
ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষনা করবার যার এত ইচ্ছে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সাথে যার কনফেডারেশনের এমন প্রবল সংযোগ সেই তিনি ক্ষমতা হাতে পাবার পরে সংবিধানের ৪ মূলনীতি অপরিবর্তিত রাখলেন। বিশেষ করে ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি একরাতেই বদলে যাবে এমন আশংকা করা হলেও বিষ্ময়ের সাথে
১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক বিচিন্তার তরফ থেকে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিলো মোশতাকের। জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো-
‘বিচিন্তা- এক সময় এ দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েও আজকের রাজনীতিতে আপনাকে তৎপর দেখা যাচ্ছে না এর পেছনে কি হতাশা।
মোশতাক- দেখেন আমি একজন ধর্মে বিশ্বাসী। মুসলমান। কোন মুসলমানের জন্য হতাশা বলে কোন জিনিষ নাই। এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে জীবনভর রাজনীতি করেছি, মানুষের খেদমত করার চেষ্টা করেছি।‘[21]
মানুষের অনেক খেদমত করে ফেলেছিলেন খন্দকার মোশতাক। আর সেই খেদমত ছিলো আজীবন যাদের সাথে রাজনীতি করেছেন তাঁদের নৃশংসভাবে হত্যা করে হত্যাকারীদের হাত ধরে ক্ষমতায় আরোহন। জীবন সায়াহ্নে এসেও মোশতাক ধর্মীয় আইডেনন্টিই তুলে ধরেছেন তার সমস্ত ব্যার্থতা ঢাকতে। ধর্মীয় পরিচয় দিতে গিয়ে ‘হতাশ না হবার’ গল্প শুনে প্রশ্ন আসতে পারে প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন তো এটি ছিলোনা কিংবা প্রশ্নকর্তা তো এই পরিচয়ও জানতে চাননি। জানতে চেয়েছেন তার রাজনীতি এখন নেই কেন।
অথচ মোশতাক অযাচিতভাবে সামনে নিয়ে এসেছে ধর্মকে কিন্তু এটি বলতে সাহস পায়নি যে তার রাজনীতির কূটচালে সবসময় সে হয়েছে ত্যাজ্য এবং জনমানুষের কাছে ধিকৃত। জাতীয় রাজনীতিতে মোশতাকই সম্পূর্ণ অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবেই হারিয়ে গেছেন কালের গহবরে কিন্তু এই কথা বলবার সাহস ছিলোনা তার ফলে তাকে আনতে হয়েছে ধর্মের বয়ান। এই একই সাক্ষাৎকারে তাকে যখন প্রশ্ন করা হয় যে বঙ্গবন্ধুর হত্যার সংবাদ শুনে তার পরিবারের লোকদের কি হলো তখন তিনি বলেছিলেন তার ‘বিবি’ ও বাচ্চারা কাঁদতে শুরু করলো। এখানে মোশতাকের বা তার পরিবারের কুম্ভীরাশ্রুর থেকে জরুরী দেখবার বিষয় হচ্ছে স্ত্রীকে ‘বিবি’ বলে সম্বোধন করা। মনে হচ্ছে যেন এক মধ্যপ্রাচ্যের শেখ তার স্ত্রী’র পরিচয় দিচ্ছেন, কোনো বাঙালী নন।
এতকাল পর প্রশ্ন আসতে পারে ধর্মকে ব্যবহার করে কিছু আদর্শ অর্জনের আশা কিংবা কোন মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করবার আশা কি মোশতাকের ছিলো নাকি ধর্ম কেবল মোশতাকের ক্ষমতার কিছু নিজসও স্বার্থের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়েছে? উপরেই বলেছি যে এই চতুর লোকটি এটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে নিজের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও ক্ষমতায় থাকতে পারাটা প্রাথমিকভাবে জরুরী আর সে কারনেই তাকে অনেক অপ্রিয় অবস্থার মুখোমুখি হতে হলেও ক্রোধ সংবরণ করে তিনি তা মেনে নিয়েছেন পরবর্তী লক্ষ্য পুরণের আশায়। আর এই লক্ষ্য পূরনের আশায় পবিত্র ইসলাম ধর্মকে মোশতাকই অন্য আরো অনেক স্বৈরশাসকের মতই ব্যবহার করেছেন।
মোশতাক মুখে ইসলাম ধর্মের কথা বললেও ক্ষমতার কেন্দ্রে যাবার পর এটা পরিষ্কার হয়েছিলো যে এগুলো সবই ছিলো তার ‘পলিটিক্স অফ কনভেনিয়েন্ট’ তত্ত্বের আলোকে গড়া একটি বলয় মাত্র। নিজেরমত করে একটা কাস্টমাইজড শাসনের অভিপ্রায়ই ছিলো মোশতাকের মূল কথা। ভাগ্যগুণে পেয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতার চুড়ান্তে যাবার পরেও মোশতাক শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় ফন্দি ফিকির করে টিকে থাকাতাই মুখ্য মনে করেছিলেন এবং ধর্মকে শুধু প্রয়োজন্মত ব্যবহার করা হয়েছে এই ফিকিরের কারনেই। অনেকেই বলেন আরো দীর্ঘ সময় টিকে থাকলে মোশতাকই বাংলাদেশকে স্থায়ী মৌলবাদী আদলেই গড়ে তুলতেন যে আদল তিনি মুসলিম কাঠামোতে বসে স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু যুক্তির খাতিরে যদি সেটিই হতো তাহলেও মোশতাকের নিজস্ব যে চিন্তা কাঠামোর পরিচয় পাওয়া যায় সেখানে এটা বলবার জো থাকবেনা যে মোশতাক সেই কাঠামোর চুড়ান্ত রুপে কখনো তার রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে যেতে চাইতেন।
যদি যেতেনও তাহলেও সেটি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ব্যবহারের জন্য যেতেন যেমনটা পরবর্তীতে গিয়েছিলেনে আরেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। যার পুরো জীবনে ইসলাম ধর্মের সামান্যতম রেশ বা কাঠামো চাপানো না থাকলেও রাষ্ট্রের সংবিধানে ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রের ধর্ম বলে ঘোষনা দিয়েছিলো। অবাক করা বিষয় হচ্ছে সাপ্তাহিক বিচিন্তার পক্ষ থেকে যখন ১৯৮৭ সালে মোশতাককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো এরশাদের রাজনীতি সম্পর্কে তখন তিনি বিদেশী একজন সাংবাদিককে উদ্বৃত করে বলেছিলেন এরশাদ রিয়াদে একজন মুসলমান, চায়নাতে সোশালিস্ট, আমেরিকাতে ডেমোক্রেট আর দিল্লেতি সেবাদাশ’
পুরো বক্তব্য শুনে মনে হয় তিনি নিজের কথাই অকপটে অন্যের চরিত্র বিশ্লেষনে বলে দিলেন।
কেননা মোশতাক একই সাথে চেয়েছিলেন ধর্ম, অন্যদিকে চেয়েছিলেন পশ্চিমা আশীর্বাদ এবং আরেকদিকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন অবৈধ উপায়ে রক্তপাতময় রাস্তা দিয়ে পাওয়া ক্ষমতা। মোদ্দা কথা হচ্ছে যদি ইসলামধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রই মোশতাকের মানসে আকাংখিত হতো তাহলে রক্তের উপর দিয়ে অবৈধ ক্ষমতা দখলই হতে পারতো তার প্রথম বাঁধা। মোশতাকই চেয়েছিলো কেবল ধর্মকে ব্যবহার করতে আর ক্ষমতায় টিকে থাকতে যা ছিলো তার বহু বছরের আরাধ্য।
সূত্রের বিস্তারিত তথ্যঃ
[1] ‘Prison Diary 1975’, Jayaprakash Narayan, Popular Prakashan, Bombay, India, 1977, page-19
[2] গণপ্রজাতন্ত্রী বাংকাদেশের সংবিধান (৪র্থ সংশোধন) আইন-১৯৭৫। ১৯৭৫ সালের ২ নং আইন, ২৫ জানুয়ারী ১৯৭৫
[3] ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি, আবেদ খান, সময় প্রকাশনী,২০২০, পৃষ্ঠা-৯২
[4] Late Night massacre, Bachchu Rahman, 1984, Page-32
[5] সাপ্তাহিক বিচিন্তা, বর্ষ-১, সংখ্যা-২০, ১ নভেম্বর ১৯৮৭, খন্দকার মোশতাকের সাক্ষাৎকার, পৃ-১৯
[6] সাপ্তাহিক মেঘনা, খন্দকার মোশতাকের সাক্ষাৎকার, ২য় বর্ষ, ৩৩ সংখ্যা, ৩৩/০৮/১৯৮৬
[7] খতিব, পৃ-৩০
[8] খতিব, পৃ-২৪
[9] Bangladesh: A legacy of Blood by Anthony Mascarenhas, Hodder & Staughton Publication, 1986, Page-68
[10] Bangladesh: A legacy of Blood by Anthony Mascarenhas, Hodder & Staughton Publication, 1986, Page-60
[11] সাপ্তাহিক মেঘনা,২য় বর্ষ, ৪০ সংখ্যা, ২২ অক্টোবর ১৯৮৬, পৃষ্ঠা-২২
[12] DECLASSIFIED, A/ISS/IPS, Department of State, E.O. 12958, as amended, October 11, 2007
[13] Bangladesh: A legacy of Blood by Anthony Mascarenhas, Hodder & Staughton Publication, 1986, Page-81
[14] যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি, লে কর্ণেল শরিফুল হক ডালিম, নবজাগরণ প্রকাশনী, ২০০৪, পৃষ্ঠা-৫০৪
[15] The Sunday Times, 30 May 1976, Signed confession by Lt. Col Farooq Rahman & BBC Interview taken on 1/1/1976 by Anthony Mascarenhas in 1976
[16] ‘মুক্তির পথ’ পুস্তিকা, লেখক-লে কর্ণেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান ও লে কর্ণেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ, ১৯৮৩ সালে ১ম প্রকাশিত, প্রকাশক- মেজর (অব) সৈয়দ আতাউর রহমান, পৃষ্ঠা-৭৫
[17] মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাকপৃ-১৫৮
[18] Margaret P. Grafeld Declassified/Released US Department of State EO Systematic Review 06 JUL 2006
[19] মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, পৃ-১৫৭
[20][20] খতিব, পৃ-৩৫
[21] সাপ্তাহিক বিচিন্তার, বর্ষ-১, সংখ্যা-২০, ১ নভেম্বর ১৯৮৭, খন্দকার মোশতাকের সাখহাৎকার, পৃ-১৯



এই ব্লগে প্রকাশিত লেখাটি আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার ফলাফল যা যথাযথ নথিপত্র ও রেফারেন্স দ্বারা সমৃদ্ধ ও সমর্থিত। লেখাটি আপনার ভালো নাও লাগতে পারে, পছন্দ না-ও হতে পারে। আমাদের সাথে হয়ত আপনি একমত হবেন না কিন্তু আমরা ধন্যবাদ জানাই আপনি এই সাইটে এসেছেন, আমাদের লেখাটি কষ্ট করে পড়েছেন আপনার সময় ব্যয় করে, এটিও পরম পাওয়া। সবার মতামত এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দ্বিমত থাকবে, তৃতীয় মত থাকবে কিংবা তারও বেশী মতামত থাকবে আবার সেটির পাল্টা মতামত থাকবে আর এইভাবেই মানুষ শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের চিন্তাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর। আর লেখাটি ভালো লাগলে কিংবা আপনার মতের সাথে দ্বন্দ্বের তৈরী না করলে সেটি আমাদের জন্য বড় সৌভাগ্য। আমরা সেটির জন্য আনন্দিত। গুজবের জবাবে সত্য পাঠ শুভ হোক, আনন্দের হোক, এই চাওয়া। আপনার এবং আপনাদের মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি সব সময়।