মোশতাকের লুকিয়ে রাখা খুনে ক্রোধ
ছোটখাট একহারা গড়ন। সরু করে চাঁছা গোঁফ। মাথায় কালো মোরারজি দেশাই/ভোগলপুরি টুপি, গায়ে কালো আচকান, চোখে মোটা ফ্রেমের কালো চশমা। খন্দকার মোশতাকের এই বর্ণনা তার বাহ্যিক আবরণের। কিন্তু তার ভেতরের লুকিয়ে থাকা এত ঘৃণা আর ক্রোধের অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন।
খন্দকার মোশতাকের এই ক্রোধের শুরুর গল্পটা বোধকরি কল্পনাই থেকে যাবে। ঠিক কবে কোথায় থেকে তার এত ক্রোধ জন্ম নিয়েছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি; এই বাংলাদেশের প্রতি; আর কেনই বা জন্ম নিয়েছিলো।
অনুমান আর অনুমান নির্ভর অজস্র বয়ান নথি-পত্র/ রেফারেন্সসহ বিশ্লেষন সম্ভব।বই-পত্র-জার্নাল-ম্যাগাজিন,সাক্ষাৎকার, সরাসরি জানবার অভিজ্ঞতা ইত্যাদি অনেক কিছুই বর্ণনা করা সম্ভব। এইসব বর্ণনা যারা বা যিনি অনুসন্ধান করেন ও লিখেন তাঁদের একান্ত নিজের ব্যখ্যা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পুরো পরিবারসুদ্ধ খুন করবার যে পরিকল্পনা ও এই পরিকল্পনার পেছনে যে ক্রোধ ও মানসিক গঠন এটি এই পৃথিবীর কোন গবেষক বা লেখকের পক্ষে সুনির্দিষ্ট দাড়ি-কমা সহ লেখাটা শুধু কঠিনই নয়, তা রীতিমত অসম্ভবও বটে। মানুষের অন্তর্গত রক্তের ভেতর এমন এক বিষ্ময় রয়েছে যেটি ব্যখ্যা করা মনোবিদ থেকে শুরু করে লেখক, গবেষক কারো পক্ষেই বোধকরি সম্ভব নয়। একারনেই হয়ত জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখে গেছেন- ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়। আরো-এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে; আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত— ক্লান্ত করে’[1]
কয়েকটি ঘটনা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যেতে পারে। ১৫-ই অগাস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডের বাড়ি পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো। বাসার সামনে পুলিশ প্রহরা ২৪ ঘন্টা। জিল্লুর সাহেব নিজের বাড়িতেই কার্যত বন্দী জীবন যাপন করছেন। অগাস্টের শেষ কিংবা সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে খন্দকার মোশতাক তার পরিচিত এক উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার দিয়ে জিল্লুর সাহেবকে ফরমান পাঠালেন যেন মোশতাকের সাথে তিনি দেখা করেন। মাথায় রাখতে হবে মোশতাক এই ফরমান দিনের বেলায় পাঠান নি, সন্ধ্যায়ও পাঠান নি। পাঠিয়েছেন মধ্য রাতে। মোশতাকের অনুগত সেই পুলিশ অফিসার জিল্লুর সাহেবকে এসকর্ট করে বঙ্গভবনে নিয়ে গেলেন। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে বলা দরকার যে- মোশতাক সাধারণত যা করতো তা হচ্ছে কাউকে ডেকে এনে অনেক্ষন ধরে সেই ব্যাক্তির হাত কচলে দিতো হ্যান্ডশেকের নাম করে, সেই ব্যাক্তির শার্ট বা কোর্টের বোতাম ধরে ঠিক-ঠাক করতো এবং তারপর সেই ব্যাক্তির হাত নিয়ে নিজের বুকে ঠেকাতো বিনয়ের ঢঙ্গে। একই সঙ্গে মোশতাক বিভিন্ন মানুষকে, ‘বাবুরে’ কিংবা ‘বাপুরে’ বলে সম্বোধন করতো।[2][3] এইসব আচরণ, কথ্য শব্দ, ব্যবহার বা কার্যক্রম মোশতাককে বুঝবার জন্য খুবই জরুরী।
মোশতাক জিল্লুর সাহেবকে সাক্ষাৎ হতেই বুঝাতে চেষ্টা করেন যে ১৫-ই অগাস্টের ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন না এবং এর কিছুই তিনি জানতেন না। জিল্লুর সাহেব চুপ-চাপ শুনে গেলেন। এক পর্যায়ে মোশতাক জিল্লুর সাহেবকে তার ক্যাবিনেটের বেসরকারী বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে বলেন। জিল্লুর সাহেব জানান যে তিনি রাজনীতি করতে চাননা বরং আইনপেশাতে নিয়মিত হতে চান। মোশতাক অসম্ভব রকমের ঠান্ডা মাথার লোক। জিল্লুর সাহেবকে জানালেন এখনই সিদ্ধান্ত দিতে হবে না। পরিবারের সাথে কথা বলে, আরেকটু ভেবে জানাতে। সেদিন রাতে খন্দকার মোশতাক জিল্লুর রহমানকে রাতের খাবার একসাথে খাবার জন্য অনুরোধ করলেন, অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করলেন। সেপ্টেম্বরের পাঁচ তারিখ সেই একই উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা দিয়ে তাঁকে আবারও মধ্যরাতে বঙ্গভবনে ডেকে নিয়ে গেলেন। জিল্লুর সাহেব সেখানে গিয়ে একই সিদ্ধান্ত জানালেন মোশতাককে। মোশতাক তার অভিব্যাক্তি একবারের জন্য প্রকাশ করলেন না বরং সেই ‘বাপুরে’, ‘বাবুরে’ সম্বলিত নানান শব্দে বিনয় দেখালেন। জিল্লুর সাহেবের প্রতি খুব বিনয় দেখালেন। তিনি এও বললেন জিল্লুর সাহবকে যাতে অন্তত পক্ষে তিনি আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে থেকে যান সেই অনুরোধও করলেন কেননা এইসময়ে মোশতাক জিল্লুর সাহেবকে জানায় যে তিনি নাকি আওয়ামীলীগকে পুনরায় উজ্জেবিত করতে চান। জিল্লুর সাহেব তার সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। তিনি বিনয়ের সাথে জানিয়ে দিলেন আর রাজনীতিই করবেন না। তিনি শুধু মোশতাককে অনুরোধ করলেন যেহেতু তিনি একজন আইনজীবি ফলে আইন পেশাতেই তিনি বাকিটা জীবন থাকতে চান; দুটো ডাল আর ভাত খেয়ে তিনি বাঁচতে চান এবং তাঁর বাসার সামনে থেকে যেন পুলিশের প্রহরা তুলে নেয়া হয়, এই উপকার করবার অনুরোধ তিনি মোশতাকের প্রতি করলেন। খন্দকার মোশতাক খুব স্বাভাবিক ভাবেই জিল্লুর সাহেবের কথা মেনে নিলেন এবং পূর্ণ সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। মোশতাক নিজেই তার লোক দিয়ে জিল্লুর সাহেবকে বাসায় পৌঁছে দিলেন রাত ১ টার দিকে। বিষ্ময়ের ব্যাপার ছিলো সকাল পাঁচটার দিকে অর্থ্যাৎ বাসায় ফিরবার ৪ ঘন্টা পরেই জিল্লুর রহমানকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা পুলিশ কন্ট্রোল রুমে এবং পরে সেখান থেকে সেন্ট্রাল জেলে নেয়া হয়। তার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লা জেলে। পরবর্তী সময় আরো অনেকগুলো জেলেও জিল্লুর রহমানকে রাখা হয় এবং তিনি মুক্তি পান ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে।[4]
আরেকটি ঘটনা এমন-১৯৭৫ সালের অক্টোবরের ২ তারিখে মোশতাক তদন্তকারী কর্কর্তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতঃ সামরিক ফরমানের আদেশকে কিছুটা সংশোধন করে প্রকাশ করে। এই আদেশে ১৯৭৬ সালের ১৫-ই অগাস্ট থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হবে বলে ঘোষনা দেয়া হয় এবং তৎকালীন সময়ে জেলে আটক রাজবন্দীদের অভিযোগের ব্যাপারগুলো নতুন করে পর্যালোচনে করে প্রকাশের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। উল্লেখ্য এই সময়ে যত গ্রেফতার করা হয় তার বেশীরভাগই আওয়ামীলীগের সমস্ত পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাই ছিলেন। লাইলাতুল কদর উপলক্ষ্যে ভাষনে মোশতাক ১ হাজার নিরাপত্তারক্ষীকে মুক্তি দেবার তথ্য জানান অথচ যখন এই ভাষন চলছিলো অর্থ্যাৎ ওই ২ অক্টোবরেও ৯০ জন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়।[5]
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৭ অগাস্ট মোশতাক আওয়ামীলীগের প্রবীণ নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সাথ বঙ্গভবনে দেখা করেন। ১৮ অগাস্টের পত্রিকার পাতায় এই সাক্ষাৎকারের ছবি বেশ বড় করেই প্রকাশিত হয়। জানা যায় ক্যাপ্টেন আলীকে মোশতাক বঙ্গভবনে ডেকে পাঠান এবং তার মন্ত্রীসভায় আসবার জন্য এবং এই সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য অনুরোধ করেন কিন্তু মনসুর আলী তাতে রাজী হননি। খন্দকার মোশতাক সরকার ২৩ শে অগাস্ট মনসুর আলীকে দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সমাজবিরোধী অপঃতৎপরতা, ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ উপার্জনের অভিযোগে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করেন এবং পরবর্তী সময় ৩ নভেম্বর তারিখে খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে জেলের ভেতরেই অন্য বাকি তিন জাতীয় নেতার সাথে তাঁকেও হত্যা করা হয়। এই জাতীয় চারনেতাকে হত্যার প্রসঙ্গ আরো বিশদভাবে এই গ্রন্থের পরবর্তী অংশেই উঠে আসবে কিন্তু মোশতাকের ‘সাইকোলজিকাল প্যাটার্নে’র একটা পরিচয় পেতে আরো কিছু উদাহরণ এই ক্ষেত্রে দেয়া প্রয়োজন।
আওয়ামীলীগেরই এক নেতা কফিলুদ্দিন একজন মুক্তিযোদ্ধা। মিরপুরে তিনি আবাসন হিসেবে বরাদ্দ পেয়েছিলেন একটি পরিত্যাক্ত বাড়ি। মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বরাদ্দকৃত বাড়িগুলোর ক্ষেত্রে পুনঃ নিরীক্ষণ শুরু হয় এবং পুনঃবরাদ্দের আয়োজন শুরু হয় যার ফলে অনেকেই পূর্বে বরাদ্দ পেলেও পরবর্তী সময় বরাদ্দ আদেশ বাতিলের কারনে আবাসন হারাচ্ছিলেন এবং সন্তান-পরিবার নিয়ে পথে নেমে যেতে হচ্ছিলো। এমন বিপদের মধ্যে সেসব ব্যাক্তিরাই পড়ছিলেন মূলত তাঁরাই, যারা মোশতাকের পক্ষে সমর্থন দেননি কিংবা খুবই পরিচিত আওয়ামী সমর্থক। কফিলুদ্দিন ছিলেন আওয়ামীলীগের ওয়ার্ড কমিটির সেক্রেটারি। কেউ হয়তবা তাঁর নামে বরাদ্দকৃত বাড়িটি বাতিলের সুপারিশ করেছিলেন, ফলে তার বাড়িটি পুনঃবরাদ্দের জন্য সরকারি তালিকায় আসে। কফিলুদ্দি যখনই তাঁর ওয়ার্ড কমিটির বড় নেতা খন্দকার আব্দুল হামিদ সাহেবের সাথে গিয়ে বঙ্গভবনে গিয়ে মোশতাককে পূর্ণ সমর্থন নিয়ে এলেন ঠিক তার পরপরই কফিলুদ্দিনের মিরপুরের বাড়িটি তার নামেই পুনরায় বরাদ্দ করা হয়েছিলো[6]
এই প্রসঙ্গে আমার বাবা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সদস্য এডভোকেট গোলাম সারওয়ার মজুমদারের ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া একটি উদাহরণ দেয়া সমীচিন বলে মনে করি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামীলীগের কমিটিতে মোশতাকের সমর্থনকারীরা নতুন করে কমিটিতে রদবদলের আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধুর যারা ঘোর সমর্থক ছিলেন তাঁদেরকে ক্রমাগতভাবে চাপ দেয়া হতে থাকে এইসব কমিটিতে এসে মোশতাকের বন্দনা করবার জন্য এবং দেশ শান্তিতে ও সুন্দর রয়েছে এগুলো বলে এলাকায় প্রচার করবার জন্য। আমার বাবাও এমন এক চাপের শিকার হয়ে রীতিমত পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তখন। আমার বাবা ছিলেন ঘোরতর বঙ্গবন্ধু ভক্ত। জানা গেলো তিনি যদি মোশতাক সমর্থিত অংশে না আসেন তাহলে তাঁর নামে মামলা দেয়া হবে এবং তাঁর পরিণতি হবে হাজার হাজার নেতাকর্মী যারা জেলের মধ্যে নির্মমভাবে দিন যাপন করছিলেন তাঁদের মতন। আমার বাবা বাঁচার জন্য তখন কখনো ঢাকাতে কখনো অন্য জেলাতে দিনের পর দিন পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। মোশতাকের পতনের পর তিনি এলাকায় ফিরতে পারেন। আমাকে দেয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকারেই জানা যায় এই অঞ্চলের শত শত নেতা কর্মীরা এইভাবেই পালিয়ে অন্য জেলাতে চলে গিয়েছিলেন আর যারা পালাতে পারেনি কিংবা যাদের হদিস পাওয়া গিয়েছিলো তাদের গ্রেফতার হতে হয়েছিলো।[7] আমার বাবা ১৯৬৯ সালের আগ থেকেই আঞ্চলিক রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও সে বছর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে যোগ দেন।
প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যায় এই সময়ের আঞ্চলিক তরুন কর্মীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টার মতন। শহুরে রাজনীতিবিদদের অনেকেই নিজেদের আখের গোটাতে কিংবা সুযোগ সুবিধার জন্য আওয়ামীলীগের নানা পর্যায়ে মিশে থাকলেও আঞ্চলিক পর্যায়ের তথা গ্রাম-মফস্বলের রাজনীতিতে তখনও বঙ্গবন্ধুই রাজনীতির শেষ কথা এবং তাঁদের রাজনীতি ছিলো আদর্শভিত্তিক। প্রাক মুক্তিযুদ্ধ সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে যোগ দিতে হলে পরিষ্কারভাবে সদস্যভুক্তি কার্ডেই লেখা থাকতো তাঁরা ৬ দফার প্রতি আস্থার কথা, আওয়ামীলীগের প্রতি আনুগত্য বজায়ের কথা, দলের নিয়ম-শৃংখলার কথা ও কোন প্রলোভন বা চাপে নীতিচ্যুত হবেন না সে কথা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবার পর এই গ্রামাঞ্চলের মানুষই রক্ত দিয়েছেন, যুদ্ধ করে টিকে থাকতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে ময়মনসিংহের বিশ্বজিৎ নন্দীর কথা উদাহরণ হিসেবে আনা যেতে পারে। বিশ্বজিৎ নন্দী ১৯৭৬ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করলে তিনি সহ তাঁর আর বাকী সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধা জাবেদ আলী, নিখিল দত্ত, সুবোধ ধর, দিপাল দাস, মফিজ উদ্দিনকে সেনা সদস্যরা গুলি করে মেরে ফেলে। আহত অবস্থায় ধরা পড়েন বিশ্বজিৎ। বিশেষ সামরিক আদালত-২ এ বিশ্বজিতের ফাঁসীর হুকুম হয় ১৯৭৭ সালের ১৮-ই মে সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের চাপের ফলে ১৯৮৪ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকার তাঁর ফাঁসীর হুকুম রহিত করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়। বিশ্বজিতের অপরাধ ছিলো যে তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন। ১৯৮৯ সালের ১৪-ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ মুক্তি পান।
পঁচাত্তরের ১৫-ই অগাস্টের পর মোশতাক অনেকটা দানবের মত হানা দিতে লাগলো তার আকাংখিত ব্যাক্তিবর্গের উপর। মোশতাক জানতো যারা ক্যু করেছে তাদের জনভিত্তি নেই। তারা না এসেছে জনতার সমর্থনে না এসেছে ক্ষমতার স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে। ফলে এই হত্যাকান্ডের রক্তস্রোতের বিপরীতে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসন এমনভাবে সাজানো প্রয়োজন ছিলো মোশতাকের জন্য যেখানে জনমানুষের ভেতর এই ভাবনার বিস্তার ঘটে যে এই পটপরিবর্তনে খোদ আওয়ামীলীগের-ই সায় ছিলো ও তাদের ইচ্ছেনুযায়ী তা হয়েছে। হত্যাকান্ডের পরপরই সে কারনে পিজি হাসপাতালে থাকা অসুস্থ ফণীভূষন মজুমদারকে ওকথ্য ভাষায় গালাগাল করে নিয়ে আসা হয় বঙ্গভবনে। কারন ফণীভূষনের মত এমন একজন বঙ্গবন্ধু অন্তঃপ্রাণ ব্যক্তি মোশতাকের ক্যাবিনেটে থাকার নানাবিধ অন্তর্নিহিত মানে বের করা সম্ভব ছিলো। ১৫-ই অগাস্টের ঘটনার পুরোটা সময় বঙ্গবন্ধুর এক সময়ের প্রেস সচিব মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হক বাদশা ছিলেন ঠিক পাশের ৬৭৮ নাম্বার বাসায় তাঁর ছোট মামা জনাব নুরউদ্দিন আহমদ সাহেবের বাসায়। জনাব বাদশার মামীও ছিলেন আওয়ামীলীগ নেত্রী বদরুন্নেসা আহমদ যিনি ১৯৭৪ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। মিসেস বদরুন্নেসার প্রতি প্রবল ক্ষোভ ছিলো খন্দকার মোশতাকের সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই। মোশতাকের নানাবিধ কার্যক্রম মিসেস আহমদ কখনোই ভালো চোখে দেখেননি ফলে তার নানাবিধ অপকর্মের কথা তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে বলে দিয়েছিলেনে এবং মোশতাক তা জানতো। ক্ষমতা দখলের পরপরই মোশতাকের সদ্য পদায়নপ্রাপ্ত প্রেস সচিব তাজুল ইসলামকে দিয়ে ঐদিনই ফোন দেয়ায় মোশতাক এবং জনাব আহমেদ (যিনি ছিক্লেন বঙ্গবন্ধু সরকারের বন, মৎস ও পশু সম্পদ সচিব) কোথায় তা জানতে চান। জানা যায় জনাব আহমেদ সরকারী কাজে চীনে রয়েছেন। চীন সফর থেকে দেশে ফেরার পরপরই জনাব নূরুদ্দিন আহমদ গ্রেফতার হন এবং বিনাবিচারে তাঁকে ৭ বছর জেলে আটকে রাখা হয়।[8] একই দিন আমিনুল হক বাদশাকেও তাজুল ইসলাম ওইদিন বেলা ১টার দিকে পুনরায় ফোনে চায় এবং বঙ্গভবনে আসার জন্য নির্দেশ দেয়। জনাব বাদশা শরীর খারাপের অজুহাত তুলে যেতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। এরপর তিনি সে বাসা থেকে পালিয়ে যান কেননা তাঁকে ধরবার জন্য মোশতাক প্রশাসন হন্যে হয়ে খুঁজছিলো। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭ দিন পর আমিনুল হক বাদশাকে গোপনে লন্ডনে পালিয়ে যেতে হয়।[9]
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই অংশে বলাটা জরুরি। আগরতলা সার্কিট হাউজে ১১ এপ্রিল রাতে খাবার পরের বৈঠকে নতুন নাটকের জন্ম দিলেন খন্দকার মোশতাক। তিনি হঠাৎ করেই মুজিব নগর সরকারের নেতৃবৃন্দের কাছে জানিয়ে দিলেন তিনি মক্কায় হজ্ব করতে চলে যেতে চান এবং তার মৃত্যু হলে যাতে তার লাশ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোশতাকের প্রচন্ড মণক্ষুন্ন। কারন অনুসন্ধানে জানা গেলো তিনি হতে চেয়েছিলেন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী। তার বন্ধু ডাঃ টি হোসেনের মাধ্যমে জানা গেলো সে আগ্রহের কথা। মোশতাকের দাবী তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ফলে প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা তার ‘অধিকারের’ মধ্যে পড়ে। পুরো আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে সারারাত দীর্ঘ আলোচনা ও শলাপরামর্শের পর ঠিক হলো মোশতাক পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পদে থাকতে রাজি। (অবশ্য আইনমন্ত্রীর কার্যাভারও মোশতাকের উপর বর্তায়) দলীয় এমন ‘হঠাৎ সংকট’ অবস্থায় সকলের ঘুম হারাম হবার যোগার হয়েছিলো। সুরাহা হওয়াতে সে রাতে আনন্দে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করলেন চট্রগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী। প্রায় আধাঘন্টা ধরে তিনি মোনাজাত করেন।[10]
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েই মোশতাকের আগ্রহে এই মন্ত্রণালয়ের সচিব হন মাহবুবুল আলম চাষী এবং গণসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান তাহের উদ্দিন ঠাকুর। এই সময়ে মোশতাকের প্রতিনিধি দাবী করে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত আওয়ামীলীগের সাংসদ কাজী জহিরুল কাইয়ুম সামনে আবির্ভূত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৩১ শে জুলাই কলকাতায় তৎকালীন আমেরিকান কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা যথাক্রমে হেস্টিংগোন্ডা[11] এবং পরে জর্জ বি গ্রিফিনকে জানান যে আওয়ামীলীগ পাকিস্তানের সাথে একটি সমঝোতায় আগ্রহী এবং এই কাজে মোশতাকই তাকে পাঠিয়েছে। কাইয়ুম আওয়ামীলীগ, পাকিস্তান ও ইয়াহিয়ার সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চান বলে জানান।[12] কাইয়ুম ৭ ই অগাস্ট পুনরায় আবার কনসুলেটে পলিটিকাল অফিসারের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তিনি সেখানে আবার নিশ্চিত করলেন যে তিনি মোশতাকের আদেশেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই যোগাযোগ করছিলেন। যদিও বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে মোশতাক যখন সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখ কনসাল জেনারেল অফিসের রাজনৈতিক সচিব Poloff এর সাথে আলোচনা করেন তখন তিনি এই কাইয়ুমের প্রসঙ্গ কিংবা তিনি যে যোগাযোগ করেছেন এই প্রসঙ্গে একবারও কথা বলেন নি।[13] এই আলাপেই মোশতাক পাকিস্তানের সাথে একটি সমঝোতায় আসবার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এইসব যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য মুজিবনগর সরকারকে অন্ধকারে রেখেই করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অশোক রায় মুজিবনগর সরকারের কর্তাব্যাক্তিদের জানালে[14] বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং জানা যায় মুজিবকে বন্দী রেখেই মোশতাক পাকিস্তানের সাথে একটি কনফেডারেশনের ছক কষেছিলেন। কনফেডারেশনের তথ্যটির আরো জোরালো প্রমাণ দেয় বারবার মোশতাকের প্রতিনিধি বলে পরিচয় দেয়া গাজী কাইয়ুম রেজার ১৪ অগাস্টের যোগাযোগে। যেখানে মার্কিন কনসালের রাজনৈতিক কর্মকর্তার সাথে পুনরায় যোগাযোগের সময় (৩১ জুলাই, ৭-অগাস্টের পর) স্পস্ট করে জানায় যে সমঝোতার প্রশ্নে আওয়ামীলীগ ‘স্বাধীনতার থেকেও কম কিছুতে’ আগ্রহী[15][16]। ভারতকে উহ্য রেখে মোশতাকের এই একক সমঝোতার চেষ্টা ভারত ভালোভাবে নেয়নি এবং একইসাথে মুজিব নগর সরকারকে অন্ধকারে রেখে মোশতাক, কাইয়ুম ও হোসেন আলীদের এই প্রচেষ্টা স্পস্টত সন্দেহ জাগিয়েছিলো মোশতাকের পরিকল্পনা মূলত কি ছিলো সেটি নিয়ে। হয় বঙ্গবন্ধু না হয় স্বাধীনতা, এমন দুটো’র একটা অপশন দিয়ে খন্দকার মোশতাক, চাষী, তাহের ঠাকুর এক ধরনের প্রোপাগান্ডা প্রচার করতে থাকে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি’ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার, বন্দী করা ও বিচার এগুলো জেনেভা কনভেনশনের ৪ নং অনুচ্ছেদের বরখেলাফ বলে আলাপ উত্থাপন করেন। পরে এই বিষয়ে তিনি নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী শন ম্যাকব্রাইডের কাছ থেকে একটি লিখিত মতামত আনেন। ব্যারিস্টার আমিরুলের ইচ্ছে ছিলো এই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবার এবং বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষন করা। এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সাথে কথা বলতে গেলে তিনি আইনমন্ত্রী হিসেবে মোশতাকের সাথে আলাপের পরামর্শ দেন। ব্যারিস্টার আমিরুল যখন এই বিষয়ে কথা বলতে যান তখন মোশতাক তাঁকে বলেন, ‘You Must decide, whether you want Sheikh Mujibur Or Independence. You can’t have both’[17]
ব্যারিস্টার আমিরুলের এই বক্তব্যকে সমর্থন করে প্রখ্যাত সাংবাদিক-লেখক-কলামিস্ট এবং একুশে ফেব্রুয়ারী গানের রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরীর গ্রন্থ ‘ইতিহাসের রক্ত পলাশ-পনেরোই অগাস্ট ১৯৭৫’, এই গ্রন্থে জনাব চৌধুরী বলেন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মোশতাক গং একটি প্রচারপত্র বিলি করেন যার শিরোনাম ছিলো ‘ইন্ডিপেন্ডেস অর মুজিব? স্বাধীনতা বা মুজিব?’ তাঁর মতে, প্রচারপত্রটির মূল বক্তব্য ছিলো আমরা যদি পাকিস্তানের সাথে সর্বাত্নক যুদ্ধ শুরু করে দেই তাহলে তাহলে পাকিস্তানীরা কারাগারে শেখ মুজিবকে হত্যা করবে। শেখ মুজিব ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। অর্থ্যাৎ স্বাধীনতার দরকারের চেয়ে মুজিবের মুক্তি প্রয়োজন এবং মুজিবের মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সাথে আলোচনার দরকার।[18] পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত চাতুরীর সাথে সাথে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো যেখানে প্রথম শোনাতেই মনে হতে পারি এটিই ছিলো সঠিক। যেন একই সাথে মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবী চলতেই পারেনা। ব্যারিস্টার আমিরুলকে বলা বক্তব্য আর মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে অজ্ঞাতনামে বিলানো প্রচারপত্র এই দুইই ছিলো পুরো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরী ও ষড়যন্ত্রের সামিল। মোশতাক গ্রুপদের এই প্রচারণা খোদ বঙ্গবন্ধুর কানে এইভাবে তোলা হয় যে তাজউদ্দিন আহমদ মুজিবের জীবনের পরোয়া না করে তাঁকে জেলে হত্যা করতে পরিকল্পনা করেছিলো এবং স্বাধীন দেশে নিজেই ভাগ্যবিধাতা হতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবারকেও প্রভাবিত করেছিলো বলে আব্দুল গাফফার চৌধুরী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন[19]
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার অধরা পাকিস্তানী কনফেডারেশনের পুরোনো অতৃপ্ত দুঃখটার কথা আরো জানা যায় আমেরিকার উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া নথির মাধ্যমে। জাতির পিতাকে হত্যা করবার পর ২০ অগাস্ট ১৯৭৫ সালে তৎকালীন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টারের সাথে প্রথম সাক্ষাৎকারের পর যে তারবার্তা ওয়াশিংটনে পাঠানো হয় সেখানে মোশতাক বারবার বোস্টারের হাত চেপে ধরছিলেন[20] ( অবশ্য এমন করেই হাত চেপে ধরেছিলেন তিনি ১৯৭১ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর মার্কিন কন্সালের রাজনৈতিক সচিব Poloff এর উপরে উল্লেখিত সেই লম্বা বৈঠকের সময়।[21] এই অধ্যায়ের শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম হাত চেপে ধরে অপর ব্যাক্তির হাত অনেক্ষণ ধরে কচলে দেয়া, কচলানো শেষে নিজের বুকের সাথে সেই হাত লাগানো, বিনয়ে নুয়ে পড়া, ‘বাবুরে’ বা ‘বাপুরে’ বলে সম্বোধন ছিলো মোশতাকের চরিত্রের অন্যতম দিক)।
মোশতাক যে শুধু মুজিবনগর সরকারের সাথেই রহস্যময় এই ছলনার খেলা খেলেছে তা নয়। তার এই কুটিল বুদ্ধির মার-প্যাঁচ সে মার্কিনিদের সাথেও খেলেছিলো। একদিকে কাইয়ুম রেজার মাধ্যমে মোশতাকের প্রতিনিধি হিসেবে এক ধরনের প্রস্তাব এবং অন্যদিকে তার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুল আলম চাষীর মাধ্যমে ৮-ই অগাস্ট তারিখে মার্কিনিদের কাছে এই বার্তা পাঠানো হয় যে মুজিব নগর সরকারের সাথে কাইয়ুম রেজার ভাবনার কোনো ঐকমত্য নেই এবং এই ব্যাপারে তিনি জানেন না।[22]
মুক্তিযুদ্ধকালীন মোশতাকের এইসমস্ত ঘটনা মুজিবনগর সরকারকে চরমভাবে বিব্রত করে এবং পরবর্তীতে এই ঘটনার রেশ আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর মোশতাককে আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেয়া থেকে যেখানে মনে করা হয় এটি মোশতাকের অবস্থানের অবনমন ও শাস্তি। মোশতাক পুরো ব্যাপারটিকে তাকে অপমান করবার সামিল বলেই মনে করতে থাকেন আর এর প্রধান কুশীলব হিসেবে তিনি তাজউদ্দিন আহমদকে সূচিত করেন। দেশে ফিরে মোশতাক অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। এমনকি বঙ্গবন্ধু বন্দীদশা থেকে দেশে ফিরলে তাঁর একজন প্রধান সহচর হিসেবে নিজেকে প্রকাশের সমস্ত চেষ্টাই মোশতাক করতে থাকে। ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ ইং তারিখে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলে মোশতাক উড়োজাহাজ থেকে নামতে না নামতেই বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে চুমু খায় ও আলিঙ্গন করে।[23] মোশতাক মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দিনের ভূমিকার কথা মনে রেখেছিলো এবং শেষ পর্যন্ত সে তার এই ক্রোধ তাজউদ্দিনকে মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দেবার ষড়যন্ত্র এবং পরিশেষে নিজে ক্ষমতা দখল করে হত্যা করবার মধ্য দিয়েই প্রশমন করে।
গাফফার চৌধুরী মোশতাককে বিশ্লেষন করতে আরো কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তাঁর গ্রন্থে।[24] ১৯৭৪ সালের ৩১ শে মে বিকেলে বঙ্গবন্ধুর মা মারা যান। এই মৃত্যুর পর মোশতাক এমন কাঁদা কাঁদলেন যে বাইরের কেউ দেখলে মনে করবে খুব সম্ভবত মোশতাকের নিজের মা মারা গেছেন। এই ঘটনার আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায় আব্দুল লতিফ খতিবের ‘হু কিলড মুজিব’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে লেখক বলেন মুজিবের মা মারা যাবার পর মুজিব মা’কে স্পর্শ
করতে চাইলে তাঁর বোন বাঁধা দেন কারন মৃত মায়ের শরীর স্পর্শ আপন ছেলের জন্যও সঠিক নয়; ইসলামের এমন নিয়মের কারনে। কিন্তু খন্দকার মোশতাক চট করেই তাঁর গায়ে স্পর্শ করে বসেন যার কারনে তাকে ভৎসনাও শুনতে হয় কিন্তু মোশতাক কান্না আর বিনয়ের এত গভীর স্তরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে মনে হয়েছিলো এটাই খুব সম্ভবত স্বাভাবিক।[25] গাফফার চোধুরী তাঁর গন্থে আরো বলেন মুজিবের বিভিন্ন সফরে মোশতাক আগে দৌড়ে পথ করে দিতেন, অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মুজিবের পাশে বসে থাকতেন। বিদেশ থেকে ফিরেই সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাসায় চলে যেতেন এবং বেগম মুজিবকে গিয়ে বলতেন যে দেশের বাইরে থেকে ফিরেই নিজের বাসায় না গিয়ে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাসায় চলে এসেছেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, একবার বঙ্গভবনে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। গিয়ে দেখেন মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন এই বলে যে গাফফার চৌধুরী দীনিক জনপদে সরকারকে সমালোচনা করে লেখা লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে গাফফার চৌধুরীকে অপদস্থ করে নিজেকে অনুগত প্রমাণ করবার চেষ্টা।আবার এই মোশতাকই বাইরে দেখা হলে গাফফার চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছাস নিয়ে এমন সমালোচনার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরতেন।[26]
এ এল খতিব, তাঁর ‘হু কিল্ড মুজিব’ গ্রন্থে এও বলেছিলেন যে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে মোশতাক মাত্র ৭০০ ভোটে নির্বাচিত হয় তার কুমিল্লার আসন থেকে যদিও সেই সময় জাসদ এই জয়কে সন্দেহের কালিমায় লিপ্ত করবার সমস্ত চেষ্টা করে। খতিব জানান, যদি শেষ দিকে মুজিব মোশতাকের নির্বাচনী প্রচারণায় না যেতেন তাহলে এই জয়ও ছিলো অসম্ভব। মোশতাকের গ্রহণযোগ্যতা জনতার কাছে এতটাই ছিলো নিম্নমুখী। এই ব্যাপারটা নিয়েও মোশতাক রাগ পুষে রাখে। দলের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জানতে চায় মুজিবের মত এতবছর সে জেল খাটলেও কেন তার এত জনপ্রিয়তা?[27] পঁচাত্তরের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ তাঁর লিখিত গ্রন্থেও মোশতাকের ক্রোধের শিকার হবার ঘটনা বর্ণনা করেন। তৎকালীন সরকারের নির্দেশে ‘অপারেশন সিলভার লাইনিং’ এর ফলে কুমিল্লাতে এক নারী সংসদ সদস্যের বাড়ির বাগানে প্রচুর পরিমাণে গুড়ো দুধের মজুদ ও অবৈধ অস্ত্র পাওয়া যায়। সেই নারী সংসদ সদস্য ছিলো মোশতাকের অনুগত। মোশতাক এই ব্যাপারে শফিউল্লাহকে আগে না যাবার নির্দেশ দেন এবং একই সাথে বঙ্গবন্ধুকে জানান যে সেনাবাহিনী অহেতুক এক নারী সংসদ সদস্যকে নাজেহাল করছে। কিন্তু সেনা প্রধান প্রমাণ-পত্র হাজির করে দেখান যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই এই অভিজান চালানো হয়েছে এবং কি কি উদ্ধার করা হয়েছে তারও একটি তালিকা দেখান। এই বিষয় সুরাহা করবার জন্য তা তাজউদ্দিন আহমদের কাছে গেলে তিনি সেনাবাহিনীর কর্মকান্ড সঠিক বলে অভিমত দেন। মোশতাক পুরো বিষয়টাকে চরম অপমান হিসেবে নেন এবং মনে করেন এতে করে তাকে অপদস্থ করা মোশতাক সব কিছুই মাথায় রেখে দেয় যার প্রমাণ পাওয়া যায় ক্ষমতা দখলের ৯ দিনের মাথায় শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধানের চেয়ার থেকে সরিয়ে দেবার মাধ্যমে।[28]
সাংবাদিক উদিসা ইসলামের একটি নিবন্ধের সূত্রে জানা যায় -২০১৬ সালে শোক দিবসের এক সভায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘‘১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট। মাগরিবের নামাজের সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে দেখা করতে যান আমার পিতা। সেখানে আগে থেকে বসা ছিলেন খন্দকার মোশতাক ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর। পিতা যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু পাশের কক্ষে গেলেন। বঙ্গবন্ধু উঠে যাওয়ার পরপরই আমার বাবাকে মোশতাক ‘বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে একটু নামাজ পড়ার অনুমতি নিয়ে দিতে বলেন।’ তখন আমার পিতা মোশতাককে বলেন, ‘নামাজ পড়ার জন্য অনুমতি নেওয়ার কি দরকার আছে। আপনারা যদি নামাজ পড়বেন তাহলে আপনারাই অনুমতি চান না কেন?’ পরে বঙ্গবন্ধু আসার পর মোশতাকদের নামাজ পড়ার জন্য যেতে বললেন।’’ এই দুই জনের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ধারণা কেমন ছিল বলতে গিয়ে আনিসুল হক আরও বলেন, ‘তারা দুজন নামাজ পড়তে যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ও আমার পিতা কথা বলতে শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধু আমার পিতাকে বললেন—সুনির্দিষ্ট খবর আছে যে খন্দকার মোশতাক আমার পিতাকে মেরে ফেলবে। আমার আব্বা হজম করে নিয়ে বললেন, যদি এরকম খবর থাকে তাহলে আমাকে (আইনমন্ত্রীর বাবা) না, তোমাকে (বঙ্গবন্ধু) মারবে? তার কারণ হচ্ছে, আমাকে মারলে তার একটা বুলেটেরও দাম উঠবে না। তোমাকে মারবে। উনি (বঙ্গবন্ধু) তখন বলেছিলেন, খন্দকার মোশতাকের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত হারামিতে ভরা। ওকে বাংলাদেশের কেউ চেনে না, আমি ছাড়া।[29]
‘খন্দকার মোশতাক ও তাহের উদ্দিন ঠাকুরের এমন তোষামোদির উদাহরণ দিতে গিয়ে সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখক হারুন হাবীব বলেন, ‘তখন সবে বাসসে ঢুকেছি। খন্দকার মোশতাককে তখন দেখেছি বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে। বেশিরভাগ সময় তার সঙ্গে থাকতেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা। সিকান্দার আবু জাফর সেদিন মারা গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা কাভার করতে গিয়ে দেখি—খন্দকার মোশতাক ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর বিমর্ষ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। তারা সেদিন গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনও কথা বলেননি। কুমিল্লা সেনানিবাসে (নবীন অফিসারদের) প্রথম পাসিং আউটের দিনের কথা মনে পড়ে। বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টারে করে যখন সেখানে পৌঁছালেন, এই দুই জন দৌড়ে গেলো এবং তাহের উদ্দিন ঠাকুর বঙ্গবন্ধুর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো, মোশতাক চুমু খেলো’[30]
রাজনীতির পুরোটা সময় ধরে মোশতাক তার ভেতরকার রাগ আর ক্রোধ এমনভাবে চাপিয়ে রেখেছিলো যেখানে ১৫ অগাস্টের পরের মোশতাকের এই নতুন পরিচয় ছিলো সকলের কাছেই অজানা এক চরিত্র। যদিও আওয়ামীলীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা মোশতাক পরিচিত ছিলো ডানপন্থি রক্ষনশীল ব্যক্তি হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মোশতাক ও তার সহচরদের ভূমিকা এবং সে সময়ে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করবার যে পরিকল্পনা মোশতাক প্রায় গুছিয়ে এনেছিলেন সেসব ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে মোশতাকের ১৫ অগাস্ট পরবর্তী চরিত্র মেলানো সম্ভব। কিন্তু মোশতাক এমন এক চরিত্রের ছিলো যিনি হাজারবার সমালোচিত কিংবা তার কর্মকান্ডের জন্য তিরষ্কৃত হলেও এক পরম দক্ষতায় সেসব লুকিয়ে রাখতে পারতেন। ভেতরে প্রবল ঘৃণা আর ক্রোধ মুহুর্তেই অদৃশ্য করে রাখতে পারতেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী খুব যথার্থ বলেছিলেন মোশতাকের ব্যাপারে। তিনি লিখেছিলেন ‘বিচিত্র এই মোশতাক চরিত্র। মাথায় টুপি। মুখে মধু। মন ভরা ছলনা।[31] গাফফার চৌধুরী মোশতাকের এসব কিছুর আড়ালের ঘটনাকে মন ভ’রা ছলনা বলে অভিহিত করলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এগুলো শুধু ছলনাই ছিলোনা ছিলো তার সমস্ত ক্রোধকে পরম দক্ষতায় লুকিয়ে রেখে মুখে হাসি এনে সহ্য করবার এক অদ্ভুত অভিনয় এবং একটা সুযোগের প্রতীক্ষা মাত্র। কতটা প্রবল তার ঘৃণা ছিলো সেটি যানা যায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবার পর তার বিচার প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করে দেবার জন্য যে ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ পাশ করে সেটির নাম করণের মাধ্যমে। ১৯৯৩ সালে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন আজকের সূর্যদোয়ের এক প্রতিবেদক ১৫ অগাস্টের অন্যতম অভিযুক্ত লে কর্ণেল (বরখাস্ত) ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে তিনিই প্রতিবেদককে খন্দকার মোশতাকের একটি উক্তি শোনান, যেখানে খন্দকার মোশতাক তাচ্ছিল্যভ’রে বলেছিলো, ‘ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ হচ্ছে মুজিবের চল্লিশার উপহার’,[32]
বঙ্গবন্ধুর প্রতি মোশতাকের ক্রোধের সলুক সন্ধান করতে গেলে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে শুরু করে ‘আওয়ামী লীগ’ হওয়া পর্যন্ত এর কাউন্সিল এবং সেখানে মোশতাকের দলীয় পদের অবস্থান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দলীয় পদ প্রাপ্তির অবস্থানকে তুলনামূলক বিশ্লেষনে আনাটা জরুরী। অনেক লেখকই ১৯৪৯ সালের ঢাকার স্বামীবাগের রোজ গার্ডেনে (পরবর্তীতে বেঙ্গল স্টুডিও) আওয়ামী মুসলিম লীগের ২৩-২৪ জুনের সমাবেশের একটি প্রকাশ্য দ্বন্দের কথা তোলেন। সাংবাদিক আবু আল সাঈদ[33], আব্দুল গাফফার চৌধুরী[34] এবং লেখক হালিমদাদ খান[35] প্রায় একই বিষয়ের অবতারণা করেন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে মোশতাককে সহ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে করা হয় যুগ্ন সম্পাদক। বয়সে মোশতাক জ্যেষ্ঠতার বিচারে বঙ্গবন্ধুর থেকে বড় হলেও যুগ্ন সম্পাদকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে আসীন না করবার ক্রোধ মোশতাকের রয়ে যায়।[36] শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বলা হলে মোশতাকের সাথে আসা সমর্থকেরা এতে প্রতিবাদ করে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে মুজিব কমিউনিস্টদের প্রতি দূর্বল এবং মনে মনে একই আদর্শের ব্যাক্তি ফলে আওয়ামী মুসলিম লীগের যে আদর্শ সেটা মুজিব ধারন করেনা এবং এই কারনে তাঁকে যুগ্ন সাধারণ সম্পাদকের পদও দেয়া যায়না। মোশতাকের সমর্থকদের এই ভাবনাটির শুরু ও বিস্তার কোথায় এটি জানা না গেলেও একটি ঘটনার কথা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে বলে নেয়া ভালো। ১৯৪৭ সালের পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান যখন জেলে যান তখন সেই একই জেলে বন্দী ছিলেন কমিউনিস্ট রণেশদাশ গুপ্ত। সংবাদ এলো যে ছাত্রদের ছেড়ে দেয়া হবে কিন্তু তরুণ শেখ মুজিব সাফ জানিয়ে দিলেন রণেশ দাশগুপ্তকে ছেড়ে না দিলে তাঁরা যারা ছাত্ররা আটক রয়েছেন তাঁরাও এখান থেকে নড়বেন না।[37] এই ঘটনাটি তৎকালীন সময়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরী করে এবং আওয়ামী মুসলিম লীগারদের এই প্রগতিশীল অংশের প্রতি তৎকালীন কমিউনিস্ট রাজনীতি যারা করেন তাঁদের একটা মেলবন্ধন রচিত হয়। বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। রোজ গার্ডেনের সেদিনের প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ভাসানী এইসব ভাবনাকে অমূলক বলে জানিয়ে দেন এবং তাঁকে উক্ত পদেই বহাল রাখেন। উল্লেখ্য যে এই সময় শেখ মুজিবুর রহমান জেলে ছিলেন। ‘শেখ মুজিবের কমিউনিস্ট প্রীতি রয়েছে’ এই ধারনাটি মোশতাক দলের ভেতর ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করতে থাকে। এসব ছড়িয়েও মোশতাক খুব একটা সুবিধা করতে পারলেন না বরং ক্রমশ তিনি সোহরোয়ার্দী ও ভাসানীর প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে লাগলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক তৎপরতায় তিনি সেসময় সবাইকে ছাড়িয়ে যান। কখনো কখনো তিনি শুধু একবেলা মুড়ি খেয়ে কিংবা মাথার নীচে খবরের কাগজ গুঁজে রাত কাটিয়ে দিতেন আর গ্রাম থেকে গ্রাম চষে বেড়াতেন দল গোছাবার জন্য। দল ও দলের আদর্শের প্রতি তাঁর এই বিরামহীন ছুটে চলা অস্বীকার করতে পারেনি কেউই। ক্রমশ তিনি তরুন-যুবকদের প্রিয় ‘মুজিব ভাই’ হয়ে উঠেছিলেন এবং সাধারণ জনতা তাঁকে নিজের ছেলের মত করে ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলেন। এই ক্রমাগত জনপ্রিয়তার অন্যদিকে খন্দকার মোশতাকের হিংসা, ক্রোধ, ঘৃণা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়তে থাকে। ১৯৫৩ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু সাধারণ সমাপদক পদে নির্বাচিত হলেও মোশতাককে কোনো পদ দেয়া হয়নি এমনকি কার্যকরি পরিষদেও তার স্থান হয়নি। এই বিষয়ে লেখক মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক তাঁর ‘এবং মোশতাকের মন্ত্রীসভা, বেঈমানীর ইতিবৃত্ত’, গ্রন্থে (পৃ-১৫০) বলেন-
‘পরবর্তী কাউন্সিলে (১৯৫৩) তাঁকেই সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয়। এতে ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ হলেও দলে সমর্থনহীনতার কারণে মোশতাককে চুপসে যেতে হয়। তদুপরি সেই ক্ষতজনিত ক্ষোভ তার ভেতর থেকে কখনো তিরোহিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও বদান্যতায় পরবর্তী সময়ে পার্টিতে একটি সম্মানজনক অবস্থানে অবস্থান করেও মোশতাক প্রতিহিংসা চরিতার্থকরণের বাসনা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি। আওয়ামী লীগে খন্দকার মোশতাকের অবস্থানের দিকে তাকালে দেখা যায়; দলটি প্রতিষ্ঠিত হবার ৪ বছর পর, ‘১৯৫৩ সালে পুরান ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে ৩-৫ জুলাই তিনদিনব্যাপি আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।” কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয় এবং খন্দকার মোশতাককে কোনো পদ দেওয়া হয়নি। এমনকি কার্যকরি পরিষদের সদস্য পদেও তাকে স্থান দেওয়া হয়নি।‘
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে খন্দকার মোশতাক যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন এবং নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সাকের অক্টোবরের ২১-২৩ তারিখের কাউন্সিলে দলের সভাপতি হন ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু এবারও কোনো পদ দেয়া হয়নি খন্দকার মোশতাককে। এই কাউন্সিলেই যখন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি কেটে আওয়ামী লীগ করবার যাত্রা শুরু হয় তখন খন্দকার মোশতাক এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। মোশতাক বন্ধুর বেশে শেখ মুজিবকে বুঝাতে শুরু করে যে, এটা ভাসানীর একটা নতুন চাল। দলকে কমিউনিস্ট ব্লকে নিয়ে যাবার ফন্দি। শেখ মুজিব মোশতাককে জানান যে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেয়ার প্রস্তাব শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ছিলো, ভাসানীর নয়। মোশতাক তবুও বোঝাতে থাকে এতে করে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে এবং ভারত লাই পেয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ পড়ে যায়। এইসময় এডভোকেট আব্দুস সালাম খান সহ ২২ জনের নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ দলটিতে মোশতাক যোগ দেবার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর এই দলে যোগ দেননি বরং চতুর মোশতাক পরিবর্তিত আওয়ামীলীগেই থেকে যায়। ১৯৫৭ সালের কাউন্সিলেও ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলের মত দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকে এবং মোশতাক থাকে পদশুন্য।[38] আব্দুস সালাম খানদের আওয়ামী মুসলিম লীগে তখন ফান্ড নিয়ে হাতাহাতি হয় এবং এই হাতাহাতিতে মোশতাক আহত হয়ে কিছুদিন শয্যাশায়ীও থাকে। এটা সেই সময় ঘটে যখন মোশতাক বেশ কিছুদিন আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামীলীগ নাম করনের ফলে দলের সাথে রাগ করে আব্দুস সালাম খানদের সাথে ঘোরাঘুরি করেন যদিও এইখানেও তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে তখনো নাম লেখাননি[39] সময়ের বিবর্তনে মুসলিম লীগ হারিয়ে যেতে থাকে এবং আওয়ামীলীগ প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর মধ্যে ১৯৫৭ সালেই মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন ফলে ভাসানীর পরিবর্তে সে সময় মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ দলের সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে থেকে যান। ১৯৫৮ সালের পর যথাক্রমে ইস্কান্দার মির্জা ও আয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হবার পর সমস্ত রাজনৈতিক দল কার্যত তাদের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে এবং অনেকটা অকেজো হয়ে যেত থাকে। দীর্ঘ ১০ বছর পর ১৯৬৪ সালের কাউন্সিলে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ দলের সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। এই সময় দলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদ শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। সাংবাদিক আবু আল সাইডের মতে ১৯৫৭ সালের পর মোশতাক আওয়ামীলীগ থেকে চলে যান এবং এই সময় অর্থ্যাৎ ১৯৬৪ সালে দলে ফিরে এবং লিখিতভাবে জানায় যে সে ভুল করেছে এবং সে বুঝতে পেরেছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ধর্ম নিয়ে কাজ হয় হয়না। এই ফিরে আসার প্রবল বিরোধিতা করেন তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি মোশতাককে একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবেই সূচিত করেন এবং সে দলের জন্য ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াবে বলেই তার অভিমত ব্যক্ত করেন। মোশতাক দলে ফিরেই শেখ মুজিবের সাথে সেঁটে রইলেন। শেখ মুজিবের প্রত্যেকটি বক্তব্য আর প্রস্তাবে ক্রমাগত সমর্থন করা শুরু করেন[40] এই ফিরে আসা এবং হঠাৎ শেখ মুজিব ভক্ত হয়ে ওঠার ভেতর পেছনের কারন ছিলো মোশতাক ধীরে ধীরে নতুন করে একটা অবস্থান তৈরী করে নিতে চাইলো যেই অবস্থান সে ১০ বছর আগে হারিয়েছিলো। ৬৬ সালে ৬ দফাকে কেন্দ্র করে দলে ভাঙ্গন দেখা দিলে মাওলামা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ এবং এডভোকেট আব্দুস সালাম খানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আরেক আওয়ামীলীগ। এই অংশে যোগ দেয়ার গুজব শোনা গেলেও খন্দকার মোশতাক শেষ পর্যন্ত আওয়ামীলীগে থেকে যান। তিনি এই সময় কারাগারে আটক ছিলেন। উল্লেখ্য যে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও য়াব্দুস সালামের পরিচালিত এই আওয়ামীলীগ অংশটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত পাঁচটি দল কাউন্সিল মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, আওয়ামী লীগ (তর্কবাগীশ), জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি ‘পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে’ যোগ দেয়। অন্যদিকে মূল আওয়ামীলীগ ৬ দফার ভিত্তিতে তাঁদের কার্যক্রম জারি রাখে। ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দিলে আইয়ুব খানের কনভেনশন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দল (যেখানে আওয়ামীলীগও ছিলো) ফাতেমা জিন্নাহকে আইয়ুবের প্রতিপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই সময় মোশতাক কর্মী সভার এক ভাষনে হঠাৎ করেই ফাতেমা জিন্নাহর রাষ্ট্রপতি পদে এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে বলা শুরু করেন এবং বলেন ফাতেমা জিতে গেলে এই অঞ্চলে বামরাজনীতি শক্তিশালী হবে। ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষের রাজনৈতিক সভায় এমন বক্তব্য সকলের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করলে সাথে সাথে এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন তাজউদ্দিন আহমদ। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় মোশতাক আওয়ামীলীগকে ক্রমাগতভাবে চাপ দিতে থাকে যাতে ভারতের বিরুদ্ধে ‘কড়া প্রতিবাদ’ করে। অবশ্য এই সময় বঙ্গবন্ধু বলেন প্রতিবাদ অবশ্যই করা হবে তবে তা পাকিস্তানের কাছে।[41]
অতঃপর অনেক প্রতীক্ষার পর আওয়ামী লীগের ১৯৬৬ সালের পরবর্তী কাউন্সিলে দলের সভাপতি কর্তৃক ২৫ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হলে খন্দকার মোশতাক আহমদকে সদস্য হিসেবে কমিটিতে স্থান দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে এই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। অনেকটাই বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায় মোশতাক দলে সদস্য হিসেবে স্থান পান। ১৯৬৮ সালের কাউন্সিলে মোশতাক দলে তিন নাম্বার সহ সভাপতি হিসেবে স্থান পায় এবং তার দলীয় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু সিনিয়রিটির দিক থেক ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও নজরুল ইসলামের থেকে মোশতাক এগিয়ে থাকলেও উলত দুইজনের পরেই মোশতাকের অবস্থান থাকে যেগুলো ক্রমাগত তার সুপ্ত ক্ষোভকে আরো বাড়াতেই থাকে। ১৯৭০ সালের কাউন্সিলেও খন্দকার মোশতাকের একই পদ বজায় থাকে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে খন্দকার মোশতাককে দলের সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিলো এবং বঙ্গবন্ধু দলের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং সাধারণ সম্পাদক হন জিল্লুর রহমান। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারীর কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু সরকারের দায়িত্বে থাকার কারনে দলীয় পদ ত্যাগ করেন। এই কাউন্সিলে এএইচএম কামারুজ্জামানকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। কাউন্সিলে মোশতাককে দলের কোন পদেই আর রাখা হয়নি[42] বর্তমান দিনকাল ম্যাগাজিনে সাংবাদিক আবু আল সাঈদের লিখিত ‘বঙ্গবন্ধু মোশতাকের টুপির নীচে ডলার খুঁজতেন’, শীর্ষক দীর্ঘ নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন যে বঙ্গবন্ধু প্রায়ই মোশতাকের টুপি খুলে মজাচ্ছলে সেখানে ডলার খুঁজতেন। অবশ্য মৃত্যুর কয়েকদিন আগে সেই টুপির নীচে ডুলার না খুঁজে ‘এবার খুঁজছি সেভেন্থ ফ্লিট’ এমন মন্তব্য করেছিলেন। অর্থ্যাৎ মোশতাকের এই আমেরিকান যোগাযোগ বঙ্গবন্ধুর অজানা ছিলোনা।
মোশতাককে ঘিরে উপরের এইসব নানাবিধ ঘটনা, তথ্য, ইতিহাস সবই ভিন্নভিন্ন আলোতে মোশতাকের অসংখ্য অপকর্মের সামান্য কিছু উদাহরণের সমষ্ঠি যেখানে মোশতাকের একটা চারিত্রিক অবয়ব আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। যে চরিত্রটি চরম পর্যায়ের সাম্প্রদায়িক এবং অতি রক্ষনশীল ঘরানার দ্বিমুখী ও সুবিধাবাদী। যার পক্ষে সব পাত্রেই ধারন করে ঘাপটি মেরে থাকা সম্ভব কিন্তু তার ভিত্তিটা প্রবলভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আদর্শ দ্বারা শক্ত করে গেঁথে রয়েছে। সামনের অধ্যায়গুলোতে মোশতাককে আরো চেনা যাবে কিন্ত এটা বলা যায় যে খন্দকার মোশতাক একটা নিজের বানানো পৃথিবীর ভেতর বাস করতেন। যেই পৃথিবীতে তিনি একাই অধীশ্বর বলেই নিজের আরাধনা করতেন এবং মনে করতেন তিনি তার কোনো প্রাপ্যই পাচ্ছেন না। একই সাথে তিনি তার সমস্ত অপতৎপরতা, দূষিত চিন্তা-ভাবনা, কৃত অন্যায়কে মনে করতেন সঠিক এবং নৈব্যত্তিক পর্যালোচনায় তিনি ছিলেন অক্ষম। নিজেরই করা অন্যায় আর অবিচারকে তিনি তার ভুবনের বিচারে সঠিক মনে করে সেটির বিপরীতের প্রাপ্ত ফলাফলকে মনে করতেন ‘তার প্রতি অন্যায় করার সামিল’ এবং সেই ফলাফল মাথায় রেখে তিনি নিজের ভুবনে এনে রেখে দিতেন ‘একদিন প্রতিশোধ নেবেন’ এই আশায়। দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখা সমস্ত ক্রোধকে তিনি এক অসুস্থ উপায়ে নিঃসরণ করে দিয়েছিলেন এই বাংলাদেশে। যার ফলাফল ছিলো এতটাই ভয়াবহ যে এই বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে কেউ আর চিনতেই পারেন নি।
1. আট বছর আগের একদিন, জীবনানন্দ দাশ, শ্রেষ্ঠ কবিতা – জীবনানন্দ দাশ, বিভাস প্রকাশনী, ২০১৭
[2] সাপ্তাহিক বিচিন্তা, বর্ষ-১,সংখ্যা-২০,১৯৮৭, পৃ-১৯-২১
[3] সাপ্তাহিক মেঘনা, ২য় বর্ষ, ৩৩ সংখ্যা, ১৩/০৮/১৯৮৬
[4] সাপ্তাহিক মেঘনা, ২য় বর্ষ, সংখ্যা-২১, ৮ অক্টোবর ১৯৮৬, পৃ-১৬-১৭
[5] ‘বঙ্গভবনে মোশতাকের ৮১ দিন’, আবু আল সাঈদ, আগামী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-৬৮
[6] ‘বঙ্গভবনে মোশতাকের ৮১ দিন’, আবু আল সাঈদ, আগামী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-৫২-৫৩
[7] এডভোকেট গোলাম সারওয়ার মজুমদার, সদস্য-বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, একান্ত সাক্ষাৎকার, তারিখ- ১৯/০৮/২০২১
[8] ‘হৃদয়ে বিষাদসিন্ধু’ আমিনুল হক বাদশা, উত্তরণ প্রকাশনী, পৃ-৪১ এবং ৫৪-৫৫
[9] আমিনুল হক বাদশা, পৃ-৫৬, ৬২
[10] ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি’, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, কাগজ প্রকাশন্ পৃ-৪৭
[11] সাপ্তাহিক মেঘনা, কাজী জহিরুল কাইয়ুমের সাক্ষাৎকার, ১ম বর্ষ, ২৫ সংখ্যা, ১৯৮৫, পৃ-৩৫
[12] একাত্তরের মোশতাক ও নিয়াজি, আন্দালিব রাশদী,ভোরের কাগজ প্রকাশন, ২০২২, পৃ-১৮-১৯
[13] রাশদী, পৃ-২৩-২৪
[14] রাশদী, পৃ-৫৬
[15] রাশদী-পৃ-৩৩
[16] ‘কারা মুজিবের হত্যাকারী’, এ এল খতিব, অনুবাদ সোয়াদ করিম/হাফিজুর রশীদ হিরণ, শিখা প্রকাশনী, পৃ-২৭
[17] আমিরুল, পৃ-৮৪
[18] ‘ইতিহাসের রক্ত পলাশ-পনেরোই অগাস্ট ১৯৭৫’, আব্দুল গাফফার চৌধুরী,আগামী প্রকাশনী, পৃ-৬৮-৬৯
[19] আব্দুল গাফফার চৌধুরী, পৃ-৬৯
[20] মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড, মিজানুর রহমান খান, প্রথমা, পৃ-৬৫
[21] রাশদী, পৃ-৬৫
[22] রাশদী, পৃ-২৮
[23] খতিব, পৃ-৭২
[24] আব্দুল গাফফার চৌধুরী, পৃ- ৬৭-৬৯
[25] খতিব, পৃ-৭২-৭২
[26] আব্দুল গাফফার চৌধুরী, পৃ-৬৮
[27] খতিব-পৃ-২৯
[28] 15th August, A National Tragedy, Page-26-27
[29] ‘সব জায়গায় সবার আগে তোষামোদকারী মোশতাক ও ঠাকুর’, উদিসা ইসলাম, বাংলা ট্রিবিউন নিবন্ধ, ১০ অগাস্ট ২০২৩
[30] উদিসা ইসলাম, ঐ
[31] আব্দুল গাফফার চৌধুরী, পৃ-৬৮
[32] সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয়, ৪-১০ মার্চ,১৯৯৩, পৃষ্ঠা-৯
[33] বঙ্গবন্ধু মোশতাকের টুপির নীচে ডলার খুঁজতেন’, আবু আল সাঈদ, বর্তমান দিনকাল ম্যাগাজিন, ১৫-২১ অগাস্ট-১৯৮৮, পৃ-১০
[34] আব্দুল গাফফার চৌধুরী,পৃ-৬৮
[35] বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫, হালিমদাদ খান, আগামী প্রকাশনী, পৃ-২৫৭
[36] ‘এবং মোশতাকের মন্ত্রীসভা, বেঈমানীর ইতিবৃত্ত’, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, নালন্দা প্রকাশনী, পৃ-১৫০
[37] ‘বঙ্গবন্ধু মোশতাকের টুপির নীচে ডলার খুঁজতেন’, আবু আল সাঈদ, বর্তমান দিনকাল ম্যাগাজিন, ১৫-২১ অগাস্ট-১৯৮৮, পৃ-১০
[38] মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, পৃ-১৫১
[39] আবু আল সাঈদ, বর্তমান দিনকাল, পৃ-১১
[40] আবু আল সাঈদ, বর্তমান দিনকাল, পৃ-১২
[41] আবু আল সাঈদ, বর্তমান দিনকাল, পৃ-১৩
[42] মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, পৃ-১৫৩-১৫৪