শেখ কামাল কি ব্যাংক ডাকাতি করেছিলেন?
দু’টো প্রোপাগান্ডা আজও এই প্রজন্মের অনেকের কাছে সত্যের মত এবং এগুলো তাঁরা বিশ্বাস করেন। এর একটি হচ্ছে (১) শেখ কামাল ১৯৭৩ সালে ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন (২) শেখ কামাল মেজর ডালিমের স্ত্রীকে হাইজ্যাক করেছিলেন কিংবা উঠিয়ে এনেছিলেন।
আমি শৈশব থেকেই এই দুইটি প্রোপাগান্ডা শুনে শুনে বড় হয়েছি। একটা সময় যখন এইসব ঘটনার ভেতরে ঢুকে সত্যটাকে জানতে চেয়েছি তখন যা বের হয়েছে, সেসব শুনে ও জেনে এক ধরনের বিষাদ যেমন ভ’র করেছিলো তেমনি ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছিলো, এইসব ভিত্তিহীন নোঙরামো ছড়িয়েছিলো কারা?
১৯৭৫ এর ১৫-ই অগাস্টের পর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডকে যথার্থ প্রমাণ করবার জন্য সে সময়ের শাসক, উজির, চামচা, খুনীদের দরকার পড়েছিলো কিছু কল্পকাহিনী। যে কল্পকাহিনী ছড়িয়ে দিয়ে পুরো একটা পরিবারকে হত্যা করাটা হালাল করা যায়।
যেমন মেজর ডালিমের বউকে শেখ কামাল উঠিয়ে নিয়ে এসেছে এটি যদি ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে মেজর ডালিম এই ক্রোধে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলেছে, এই ব্যাপারটি অনেকের কাছে যৌক্তিক ও সঙ্গত হয়ে ধরা দেবে।
মানে দাঁড়ায়, একটি অন্যায় করবার পর সে অন্যায়ের পেছনে কোনো কারন না থাকলেও মিথ্যাচারের মাধ্যমে এমন একটি ঘটনা বা এমন একটি সিচুয়েশনের গল্প শোনানো, যেটি পড়ে কিংবা জেনে সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে, আচ্ছা এই কারনে করেছে? তাহলে বোধকরি ঠিকি আছে ঐ অন্যায় করাটা।
আজকের এই লেখাটি আমি লিখতে গিয়ে ইতিহাসের নানান গলি আর ঘুপচিতে উঁকি দিয়েছি। তথ্য সংগ্রহ করেছি আপনাদের জন্য এবং নিজেকে প্রস্তুত করেছি সেসব তথ্যগুলোকে সামান্যতম না পাল্টিয়ে আপনাদের কাছে তুলে ধরতে।
আজকে আমরা সবাই একসাথে ইতিহাসের কিছু সময়ে ঘুরে আসব। ধৈর্য্য থাকলে আশা করি আমার সাথে আপনারাও এই ইতিহাসের সাথী হবেন। তবে বলে রাখি, আজকে আমি শুধু ব্যাংক ডাকাতি প্রোপাগান্ডাটি নিয়ে লিখবো। ডালিমের স্ত্রী নিম্মিকে উঠিয়ে নিয়ে আসার প্রোপাগান্ডা নিয়ে লিখব এক বা দুইদিন পরে।
শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতির যে কল্প-কাহিনী আমরা শুনতে পাই সেটির সূচনার লগ্ন হচ্ছে ১৯৭৩ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায়।
শেখ কামাল তাঁর বন্ধু শাহান চৌধুরীকে ফোন দিলেন এবং বললেন তোর সাথে, তারেকের সাথে (আনোয়ারুল হক তারেক, পরবর্তীতে আবাহনীর সভাপতি), টুকুর সাথে (ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বি এন পি’র নেতা এবং এক সময় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন) অনেকদিন দেখা হয় না, আজকে তোর বাসায় আসতে চাই। রাতে আড্ডা দিব সবাই একসাথে।
একই সাথে তিনি শাহান চৌধুরীকে বললেন যাতে চাচীকে (শাহান চৌধুরীর মা) বলে রাখে সাতকড়া দিয়ে গরুর মাংশ রাঁধতে। শাহান চৌধুরীর মা’র হাতের গরুর মাংশ ছিলো শেখ কামালের বড় প্রিয়। বলে রাখা ভালো সাতকড়া দিয়ে মাংশ এই অসাধারণ খাবার। মূলত সিলেট অঞ্চলের মানুষেরা এই সাতকড়া তাঁদের খাদ্য রান্নায় ব্যবহার করেন।
এখানে আরেকটি ব্যাপার উল্লেখ্য যে, এই শাহান চৌধুরীর বড় ভাই শমসের মবিন চৌধুরী যিনি এক সময় বি এন পি’র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং বি এন পি’র আমলে পররাষ্ট্র সচিব-ও ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিকল্প ধারার নেতা।
শাহান চৌধুরীর সাথে শেখ কামালের পরিচয় শেখ জামালের (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পূত্র) মাধ্যমে। শেখ জামাল পড়তেন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমার জন্য আবেগের একটা ব্যাপার যে আমিও এই স্কুলের-ই ছাত্র ছিলাম। শেখ জামাল আমাদের স্কুলের বড় ভাই, এটা ভাবতেই আমি এক ধরনের গর্ববোধ করি, এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করে আমার।
যাই হোক, ১৯৬৭ সালের দিকে শেখ কামাল তাঁর ভাই শেখ জামালকে স্কুলে নামিয়ে দিতে আসতেন। সে সময় শাহান চৌধুরীর সাথে শেখ কামালের পরিচয় করিয়ে দে্ন শেখ জামাল।
এরপর শাহান চৌধুরীর পরিবার যখন ধানমন্ডিতে চলে আসেন তখন শেখ কামাল, শাহান চৌধুরী আর তাঁদের আরেকজন বন্ধু আনোয়ারুল হক তারেক (আবাহনীর সভাপতি ছিলেন) এই তিনজন অনেকটা হরিহর আত্না হয়ে উঠেন। একসাথে আড্ডা দেয়া, ঘোরাঘুরি সবই এই তিনজন একসাথে করতেন।
তো, শাহান চৌধুরীকে সন্ধ্যায় ফোন দেবার পর শেখ কামাল তাঁর বাসায় এসে পৌঁছুলেন রাত ৯ টার দিকে। বাইরে থেকে হর্ন দিচ্ছিলেন শেখ কামাল।
শাহান চৌধুরী দরজা খুলতেই দেখেন শেখ কামাল একটি সাদা ভক্সওয়াগন মাইক্রোবাসে বসা। পরে জানা গেলো এই মাইক্রোবাসটা সালমান এফ রহমানের। মাইক্রোবাসের নাম্বার খুলনা ভ-২৪৪। একদম নতুন একটা মাইক্রোবাস যেটা শাহান চৌধুরীর দেয়া তথ্যমতে ১০০ মাইল-ও চলেনি।
শেখ কামাল তাঁর গাড়িটা নিয়ে সালমান এফ রহমানের বাসায় রেখে সালমানের কাছ থেকে মাইক্রোবাসটা নিয়ে শাহান চৌধুরীর বাসায় আসে। এরি মধ্যে শাহান চৌধুরীর বাসায় আনোয়ার সাহেব আর টুকু সাহেব পৌঁছে গেছেন। শেখ কামাল আসার আগ পর্যন্ত তাঁরা আড্ডা দিচ্ছিলেন।
শেখ কামাল আর মাইক্রোবাস থেকে না নেমে শাহান কে বললেন, যে, “চল একটু কাবাব খেয়ে আসি এখন তারপর আরো রাতের দিকে এসে সবাই একসাথে ডিনার করব।” যেই কথা সেই কাজ।
কিন্তু শাহান চৌধুরী বললেন, মাইক্রোবাস তিনি চালাতে চান। শেখ কামাল ড্রাইভিং সিট থেকে সরে পাশের সিটে বসলেন এবং সামনে কামালের সাথে আরো বসলেন তারেক সাহেব। আর পিছনের সিটে বসলেন ইকবাল মাহমুদ চৌধুরী টুকু সাহেব।
এইখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে শেখ কামাল আর তাঁর বন্ধুরা ছিলেন বেশ আড্ডা প্রিয় একটা সার্কেল। আমরা যেমন এই সময়ে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা মারি, একসাথে হলে গান বাজনা করি, খাই-দাই সে সময়েও শেখ কামালদের এই সার্কেলটাও ছিলো এমন উচ্ছল আর প্রাণবন্ত।
সে যাক। কাবাব খেতে শেখ কামালরা গেলেন এলিফেন্ট রোড আর মিরপুর রোডের যে সংযোগটা আছে (এখন যেখানে পাঞ্জাবি আর পায়জামার দোকান) সেখানে। এবং এটা বেশ নামকরা একটা কাবাবের দোকান ছিলো।
শাহান চৌধুরী কাবাব হাউসের পাশে তাঁদের গাড়িটা পার্ক করলেন এবং ভেতরে গিয়ে কাবাবের অর্ডার দিয়ে ভেতরে না বসে বাইরে চার বন্ধু আড্ডা দিচ্ছিলেন। মাথায় রাখতে হবে গাড়ি পার্ক করলেন মিরপুর রডের সাইডে।
কাবাব হাউজের ঠিক একটু পরেই ছিলো তৎকালীন ছাত্রলীগের অফিস। এখন যেখানে খুব সম্ভবত জনতা ব্যাংক। শেখ কামাল সহ চার বন্ধু লক্ষ্য করলেন ছাত্রলীগের অফিস থেকে (তখন বাজে প্রায় সাড়ে ১০ থেকে ১১ টা) অনেক কর্মীরা বের হয়ে আসছে।
শেখ কামাল শাহান চৌধুরীকে বললেন গাড়ির হেড লাইট টা মারতে এই ভীড়ের দিকে, কোনো পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কিনা দেখার জন্য।
শাহান সাহেবের গাড়ীটা যেহেতু এইদিকেই পার্ক করা হয়েছিলো ফলে উনি গাড়ির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে রাস্তা থেকেই হেড লাইটা মারলেন এবং তাঁদের পরিচিত কাজী সিরাজ, মুনীর, বরকত, হান্নান সাহেবদের দেখতে পেলেন।
শেখ কামাল তারেক সাহেবকে বললেন ওদের ডেকে নিয়ে আসতে সবাই একসাথে কাবাব খাবে। তারেক সাহেব ডেকে নিয়ে আসলেন। হান্নান সাহেবদের গ্রুপটা এসেই শেখ কামাল সাহেবকে জানালেন যে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের অফিস আর ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের অফিসে কে যেনো বোমা মেরেছে।
শেখ কামাল এই খবরে বেশ উত্তেজিত হয়ে গেলেন এবং সবাইকে বললেন গাড়িতে উঠতে। ঘটনা কি তিনি নিজে দেখে আসবেন। ফলে কাবাব অর্ডার দিলেও সেদিন আর কারোই কাবাব খাওয়া হোলো না।
আগে গাড়িতে ছিলো ৪ জন এবার হান্নান সাহেবদের গ্রুপ সহ আরো যুক্ত হলেন ৬ জনের মত। আগের মতই গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন শাহান চৌধুরী এবং তিনি আমাদের জানাচ্ছেন যে তাঁদের কাছে কোনো অস্ত্র-টস্ত্র কিছুই ছিলো না।
গাড়িয়ে চালিয়ে তাঁরা প্রথমে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে গিয়ে জানতে পারেন যে কে বা কারা সেখানে একটা পটকা ফুটিয়েছে।
শেখ কামাল তখন ব্যাপারটা জাস্ট উড়িয়ে দিলেন এবং শাহান কে বললেন এবার ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স অফিসটা গিয়ে দেখে আসবেন। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স তখন ছিলো মতিঝিলের শরীফ ম্যানশনে। ৫২, শরীফ ম্যানশন।
তাঁরা যখন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন তখন শেখ কামাল গান গাইছেন, বাকিরা হামিং করছেন নাইলে তালি দিচ্ছিলেন। মোদ্দা কথা একদল বন্ধু আনন্দ করছেন একসাথে হয়ে।
গাড়ি এই সময়ে মতিঝিলের আল হেলাল রেস্তোঁরার সামনে এসে থামে এবং শাহান চৌধুরীর ভাষ্যমতে তাঁরা গাড়িটা সেখানে পার্ক করে। এমন সময় রাস্তার ঠিক বিপরীত দিক থেকে আসা একটা লাল গাড়ি কামালদের গাড়ির দিকে ফ্ল্যাশ লাইট মারে।
শেখ কামাল উৎসাহী হয়ে জানতে চান এরা কারা যারা আমাদের দিকে ফ্ল্যাশ লাইট মারছে? এই কথার সূত্র ধরে শেখ কামাল বললেন চলো এই গাড়িকে ফলো করি। যেই কথা সেই কাজ, কামালদের মাইক্রোবাস ইউ টার্ন নিয়ে সেই গাড়িটিকে (লাল টয়োটা করোলা) অনুসরণ করা শুরু করলো।
এক গাড়ি আরেক গাড়িকে অনুসরণ করছে আর স্পিড বাড়ছে দুই গাড়িড়-ই। লাল গাড়িটা স্পীড বাড়াচ্ছে, পেছন থেকে শাহান চৌধুরীও বাড়াচ্ছেন স্পীড।
একটা পর্যায়ে শাহান চৌধুরী বললেন “আরে এইটা তো স্পেশাল পুলিশের গাড়ী”। গাড়ির জানালা দিয়ে একটা লম্বা এন্টেনা বের হয়ে আছে আর এই টাইপ বর্শির মত এন্টেনা কেবল মাত্র স্পেশাল পুলিশের কাছেই থাকে ফলে শাহান চৌধুরীর চিনতে সমস্যা হয়নি যে এটা স্পেশাল পুলিশের গাড়ী।
কামাল তখন বললেন এটা তো আরো ভালো। স্পেশাল পুলিশের কাছে জিজ্ঞেস করা যাবে যে মতিঝিলে যাওয়াটা নিরাপদ হবে কিনা।
শাহান চৌধুরী সামনের গাড়ির প্রতি হর্ন দিলেন এবং ফ্ল্যাশ লাইট দিলেন। কিন্তু টয়োটা থামা তো দূরের কথা উলটো আরো স্পিড বাড়িয়ে দিলো। এক সময় লাল গাড়িটা হোটেল ইডেনের পাশে একটা ছোট সেতু বা কালভার্টের মত ছিলো, সেটা পার হয়েই বাম দিকে দোতলা একটা সাদা বাড়ীর ভেতর ঢুকে গেলো।
এই বাড়ীটা আসলে ছিলো মতিঝিল থানা যেটা শেখ কামালদের গাড়িড় কেউ-ই জানতেন না। এই বাড়ীতে ঢুকেই লাল টয়োটার যাত্রীরা অর্থ্যাৎ স্পেশাল পুলিশ শুরু করে দিলো গুলি। লাল টয়োটার পেছনের উইন্ডশিল্ড ভেঙ্গে শুরু হয়ে গেলো এলোপাথাড়ি গুলি।
কেননা স্পেশাল পুলিশেরা মনে করেছিলো এটা সেই সন্ত্রাসীদের গাড়ি যারা ইন্ডিয়ান হাইকমিশন এবং ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের অফিসে বোমা হামলা করেছিলো। (পরবর্তীতে পুলিশের ভাষ্যে জানা গিয়েছিলো) এবং এতক্ষন তাঁদের অনুসরণ করে এখানে এসেছে।
স্পেশাল পুলিশের কাছে সংবাদ ছিলো একটা সাদা গাড়িতে করে সন্ত্রাসীরা এসেছিলো। ফলে শেখ কামালদের গাড়িটাই ঐ সন্ত্রাসীদের ভেবে শুরু হয়ে গেলো গোলাবর্ষন।
গুলির আঘাতে ড্রাইভিং সিটের শাহান সাহেবের বাম কাঁধে গুলি লাগে, শেখ কামালের গলায়, ঠিক এডামস এপেল অংশের নীচে লাগে গুলি, আনোয়ারুল হক তারেক গাড়ি থেকে হাত বের করে বার বার চিৎকার করে বলছিলো শেখ কামাল আমাদের সাথে। কে শোনে কার কথা।গুলিতে তারেকের দুই আঙ্গুল গেলো উড়ে।
লাল গাড়িটার ছাদে উঠে পুলিশ এমন ভাবে গুলি করছিলো যাতে শেখ কামালদের মাইক্রোর ছাদ দিয়ে গুলি ঢোকে। ঠিক এই ভয়াবহ অবস্থায় শেখ কামাল গাড়ি থেকে বের হয়ে ক্রলিং করে লাল টয়োটার মধ্যে থাকা পুলিশ অফিসার কিবরিয়াকে গিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, “আমি শেখ কামাল, বঙ্গবন্ধুর ছেলে”
এইবার পুলিশদের সম্বিৎ ফিরে এলো। শাহান সাহেবের মতে শেখ কামালকে দেখে কিবরিয়া সাহেবের হাত থেকে লিটারেলি পিস্তল পড়ে গিয়েছিলো। সেখানকার পুলিশ অফিসারদের তো ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। শুরু হয়ে গেলো কান্নাকাটি। কি ভয়ানক ঘটনাই না তারা ঘটিয়েছিলো। পরবর্তীতে হাসপাতালে সবাই চিকিৎসা নেয়।
এই পুরো ঘটনাটির অনেকগুলো ভার্সন আমি ইতিঘাস ঘাটতে গিয়ে পেয়েছি। সেসব ইতিহাসের মধ্যে ছিলো শেখ কামালদের মাইক্রোবাস ছাড়াও রেজাউল নামে আরেক ভদ্রলোকের আরেকটি গাড়িতে ছিলো আরো ৫ জন যারা সর্বক্ষন মাইক্রোর পেছনে ছিলেন।
এই পুরো ঘটনা নিয়ে শুধু মুক্তিযোদ্ধা শাহান চৌধুরী নন ঐ গাড়িতে থাকা হান্না সাহেব, বি এন পি’র নেতা ইকবাল মাহমুদ চৌধুরী টুকু, মুক্তিযোদ্ধা বাবু, সাংবাদিক এবি এম মুসা সহ অনেকেই আলাদা আলাদা বক্তব্য দিয়েছেন।
সবার বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা দ্বৈততা ছিলো গাড়িতে কয়জন ছিলো কিংবা কয়টা গাড়ি ছিলো এই বিষয়ে। কিন্তু একটা ব্যাপার ছিলো একই রকম আর সেটা হচ্ছে ঐদিন শেখ কামাল কিংবা তাঁর বন্ধুরা কোনো ব্যাংক ডাকাতি তো দূরের কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও জান নি।
ইনফ্যাক্ট বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের ছেলে প্রকাশ্যে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ব্যাংক ডাকাতি করতে যাবেন অস্ত্র নিয়ে এটা ভাবনাটাও ছিলো হাস্যকর। যদি শেখ কামাল অর্থ চাইতেন, তাঁর জন্য কি অর্থ আয় করাটা অসম্ভব কিছু ছিলো এই বাংলাদেশে?
ইনফ্যাক্ট, মুক্তিযোদ্ধা রুহেল আহমেদ বাবু তাঁর জার্মানীর একটি স্মৃতি শেয়ার করে আমাদের জানিয়েছিলেন যে শেখ কামালের নামে জার্মান হাই কমিশন ৫ হাজার মার্ক মুক্তিযোদ্ধা বাবুর কাছে দিয়েছিলেন যাতে কামাল সেটা মিউনিখে এসে খরচ করতে পারেন।
কামাল সেই টাকার কথা শুনে তার বন্ধু বাবুকে বলেছিলেন, “তুই সরকারী টাকা নিয়ে আসছস? সেই টাকা আমি খরচ করব? তোর মাথা কি খারাপ বাবু?” আরেকটি তথ্য মাথায় রাখবেন, সেটি হচ্ছে বাবু ছিলেন জাসদ কর্মী।
এই ছিলো শেখ কামাল। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ ই অগাস্টের পর কারা বদলে ফেলেছিলো ইতিহাস? আসলেই কি পঁচাত্তরের পর? না পঁচাত্তরের পরে নয়। সেই সময়েই অর্থ্যাৎ ৭৩ সালের ১৭ ই ডিসেম্বর জাসদের পত্রিকা দৈনিক গণকন্ঠ একটা সংবাদ ছাপায় এই শিরোনামে, “স্পেশাল পুলিশের সাথে গুলি বিনিময়ঃ প্রধান্মন্ত্রী তনয় সহ ৫ জন আহত”
এই প্রতিবেদনে যত সব আজগুবি আর মিথ্যে তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে স্পেশাল পুলিশের গাড়িটিকে লাল থেকে সাদা বানিয়ে দেয়া হয় এবং বলা হয় শেখ কামাল নাকি “সাঙ্গ-পাঙ” নিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করে। কিন্তু এটিও বলে রাখা ভালো যে জাসদের পত্রিকা হলেও এই প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়নি ব্যাংক ডাকাতির কথা বা এই জাতীয় কোনো ইঙ্গিত।
এই রিপোর্টে বলা হয় সিরাজ ও মুনীর ঢাকা মেডিকেলের ৩৩ নাম্বার কেবিনে চিকিৎসা নিয়েছিলো এবং বাকিরা ১০ নাম্বার কেবিনে চিকিৎসা নিয়েছিলো। এই রিপোর্টে শেখ কামালের গলার বাঁ পাশ থেকে বুলেট বের করা হয়েছে বলেও জানায়।
সেখানে বলা হয় শেখ কামাল, মুনীর, বরকত,সিরাজ, তারেক এবং শাহান আহত হন। এই রিপোর্ট অনুযায়ী সেখানে শেখ কামালদের একটি গাড়িড় কথা বলা হয়। কিন্তু পরনবর্তীতে শেখ কামালদের গাড়িড় সাথে যে আরেকটি গাড়িড় কথা হান্নান সাহেব বলেছিলেন সেটা কিন্তু এই রিপোর্টে বলা হয়নি। ফলে গাড়ি একটি ছিলো নাকি দুইটি ছিলো এটা নিয়ে আমার একটা কনফিউশন থেকেই গেছে।
তো বি এন পি’র বা জামাতের নেতা কর্মীরা যেই শেখ কামালকে ব্যাংক ডাকাত বানিয়ে দিয়েছিলো সেই বি এন পি’র নেতা ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী টুকু সেদিন শেখ কামালের সাথে ছিলেন এবং আরো ছিলেন বি এন পি’র নেতা শমসের মবিন চৌধুরীর ছোট ভাই শাহান চৌধুরী। তারা হয়ত জানেন না শেখ কামালকে ব্যাংক ডাকাত বলে ধিক্কার দিলে এই মিথ্যাচার তাদের দলের উপরেও আসে।
এই হচ্ছে পুরো ঘটনার সার সংক্ষেপ। আমি এই লেখাটি লিখতে প্রধানত রেফারেন্স হিসেবে নিয়েছি সেদিন গাড়ি ড্রাইভ করতে থাকা শাহান চৌধুরীর বক্তব্য এবং গাড়িতে থাকা হান্নান সাহেবের বক্তব্য আর পত্রিকার রিপোর্ট হিসেবে দেখেছি গণকন্ঠের রিপোর্ট। শাহান চৌধুরী যেহেতু সেদিন গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন এবং হান্নান সাহেব গাড়ির মধ্যে ছিলেন ফলে তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে সবচাইতে অথেন্টিক।
এই ঘটনাটির অনেক গুলো এইদিক সেদিক ভার্সন আছে। তবে সব গুলোকে একত্রিত করে দেখলেও ব্যাংক ডাকাতির কোনো নিদর্শন বিন্দু মাত্র আসে না। কোনো লেখক কোনোদিন এই ব্যাংক ডাকাতির দাবী তোলে নাই। সেটা হোক বি এন পি’র লেখক, জামাতের লেখক বা আওয়ামী বিরোধী শিবিরের কেউ। এই প্রোপাগান্ডা পুরোটাই ছড়িয়েছে মুখে মুখে।
এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ৭৫ পরবর্তী সময় মুশতাক, জিয়া, সায়েম, এরশাদ যারাই অবৈধ ভাবে ক্ষমতায় এসেছিলো তারা কোনোদিন এই বিষয়ে বেঁচে থাকা কারো বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতি করেছে, এটা তো অনেক বড় অভিযোগ। কিন্তু সেই অভিযোগ শুধু হিটলার বাহিনীর মত মুখে মুখে ছড়িয়েই জনতাকে বিভ্রান্ত করেছে মাত্র।
আমি ইতিহাসের পথ ধরে কাউকে সাধু বা সন্যাসী বানাবার জন্য এই লেখা লেখিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে সত্য ইতিহাস সকলের সামনে তুলে ধরা। এবং দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের উপর যে কালিমা লাগিয়ে দিয়েছে ডানপন্থী রাজনৈতিক দর্শনের ব্যাক্তিরা সেটিকে চ্যালেঞ্জ করা।
আমার লেখা যারা পড়েন কিংবা আগ্রহ দেখান আমি তাঁদের জন্য এই লেখাটি লিখেছি যাতে করে নতুন প্রজন্ম যারা এই মিথ্যে কল্প-কাহিনী জেনে বড় হয়েছেন, তাঁদের ভুলটা ভাঙ্গে।
আশা করি অনেকেই এই লেখাতে উপকৃত হবেন।